অস্বস্তি জাগাচ্ছে একাধিক মুখ

মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ আসছে, ধরাই ছিল৷ কয়েকটি নাম নিয়ে জল্পনাও মিলে গিয়েছে৷ তবু রবিবার রাষ্ট্রপতি ভবনের দরবার হলে দেখা গেল এমন কিছু মুখ, যা দেখে আশঙ্কা জাগছে—আবার সেই ‘খাকি শর্টস, স্যাফ্রন ফ্ল্যাগসে’র কালো দিনগুলি ফিরে আসছে না তো?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে দিল্লির ক্ষমতায় এসেছেন নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী৷ অস্বীকার করার উপায় নেই, এখনও পর্যন্ত হালআমলের অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের তুলনায় তিনি অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ, নিজের কর্তব্যে মনোযোগী এবং সততার প্রতি নিষ্ঠাবান৷ এর সঙ্গে কোনও তথাকথিত রাজনৈতিক মতাদর্শের কচকচিকে জড়ালে ভুল হবে৷ যেমন, রাজনৈতিকভাবে বর্তমানে দুজনের সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলায় হলেও এবং উভয়ের সঙ্গে উভয়ের ধাত খাপ না খেলেও নরেন্দ্র মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে কোথায় যেন একটা মিল আছে৷ সেটা হল ডাই হার্ড মানসিকতা৷ হতে পারে, সমাজের একেবারে নীচের তলা থেকে লড়াই করে উঠে আসার ফল৷ সব মিলিয়েই এবারের সাধারণ নির্বাচনে ধর্মনির্বিশেষে দেশের সিংহভাগ ভোটারের মনে হয়েছিল, মোদীর উপর ভরসা রাখা যায়৷ দিল্লির ক্ষমতায় বসার পর ছ’ মাস হতে চলল, এখনও পর্যন্ত সেই ভরসা টলেনি৷
তবু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নবসাজ দেখে কেন যেন মনে হচ্ছে, মোদী কি সত্যিই নতুন ভারত গড়তে চাইছেন, না অমিত শাহ-র সঙ্গে একযোগে ঘুরেফিরে নাগপুরের গুরুদের পরামর্শ শিরোধার্য করেই এগতে চাইছেন? নাকি, ‘স্বচ্ছ’ ভারত গড়ার অনেক স্বপ্ন দেখেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হচ্ছে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বকে? তার কারণ, তাঁর এই নয়া রণসজ্জায় একাধিক মুখের আগমন অস্বস্তি জাগাচ্ছে৷ ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়৷ তার আগে-পরে এই ধরনের মুখ বার বার সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল৷ এইসব মুখ সম্পর্কে একটাই ক্যাপশন মাথায় আসে৷ প্যাক অব উলভস৷ নেকড়ের পাল৷
১৯৩৩ সনে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির ক্ষমতায় আসে৷ তার পর দেখতে দেখতে এ রকম নেকড়ের পাল জার্মান সমাজকে আপাদমস্তক গিলে খেয়েছিল৷ ব্যাভেরিয়ার বিয়ার হল থেকে একদিন কমিউনিস্ট-বিরোধী পিটুনি পল্টন হিসাবে জন্ম নিয়েছিল যে বাদামী কুর্তার এসএস, হিটলার জার্মান চ্যান্সেলার হওয়ার পর তাদের হাত থেকে বাদবাকি জার্মানিও আর নিস্তার পায়নি৷ যদিও ক্ষেত্র ক্ষুদ্র, তবু বাম জমানায় টানা ৩৩-৩৪ বছর ধরে এহেন নেকড়ের পাল প্রত্যক্ষ করেছে গ্রামবাংলাও—সিপিএমের হার্মাদবাহিনী৷ দিদির আমলে যেমন পাড়ায় পাড়ায় গজিয়েছে বগলফোলা চাঁদাবাজ বাইকবাহিনী৷
তবে, পথেবিপথে নেকড়ের পালের দৌরাত্ম্যের সম্মুখীন হওয়া এক জিনিস, আর ক্ষমতার অলিন্দে তাদেরই পান্ডাদের আবির্ভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার৷ নরেন্দ্র মোদী নিশ্চয়ই ভোলেননি, গুজরাত দাঙ্গার সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি তাঁকে বলেছিলেন—প্রজাপালন শিখো৷ মোদী এখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নন৷ তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী৷ এখনও পর্যন্ত ধর্মনির্বিশেষে ভারতের অধিকাংশ প্রজা তাঁর উপর বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছেন৷ কিন্তু সেই বিশ্বাস ও আস্থাকে পুঁজি করে কেউ যদি তার সুযোগ নেয় এবং বিশ্বাসভঙ্গের পথ অনুসরণ করে তাহলে তার সঙ্গে ব্ল্যাকমেলারের কোনও ফারাক থাকে কি?
আবারও বলতে হচ্ছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণে এমন কিছু মুখ দেখা গেল, যাতে বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়টা বার বার মনে পড়ছে৷ প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের মুখের পুনরাবির্ভাবের সঙ্গে আগামী দিনে দেশের বিকাশের কি সত্যিই কোনও সম্পর্ক আছে, নাকি তার পিছনে রয়েছে নাগপুরের ফরমান মেনে এগনোর স্পষ্ট ইঙ্গিত?