খাগড়াগড়: কোথাকার জল কোথায় গড়াবে?

খাগড়াগড় কাণ্ড ও তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তরোত্তর উত্তপ্ত হয়ে উঠছে৷দিন যত যাচ্ছে, ততই একের পর এক পিলে-চমকানো তথ্যের সন্ধান পাচ্ছেন গোয়েন্দারা৷বৃহস্পতিবার বিস্ফোরণ যদি না ঘটত তাহলে হয়তো অনেক কিছুই চাপা থেকে যেত৷ ঠিক যেমন বউবাজার বিস্ফোরণ না ঘটলে সাট্টা ডন রশিদ খানের সঙ্গে তৎকালীন রাজ্য শাসক সি পি এমের তাবড় নেতার দহরম-মহরমের বিষয়টি পাবলিকের নজরেই আসত না৷

এ রাজ্যে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের তৎপরতা নতুন কোনও ব্যাপার নয়৷আজ থেকে ১৪-১৫ বছর আগে এন জে পি বিস্ফোরণ কাণ্ডের পর শিলিগুড়িতে সামরিক ক্যান্টনমেন্টকে কেন্দ্র করে পাক সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আই এস আই-এর চরদের সন্ধান পাওয়ার কথা অনেকেই নিশ্চয়ই ভুলে যাননি৷ঠিক একই ভাবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে জঙ্গি হামলার পর কলকাতার মার্কিন দূতাবাসে হানাদারি ও খাদিম কর্তার অপহরণের সূত্রে এ রাজ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী কট্টরপন্থী সন্ত্রাসবাদী ও অপরাধ চক্রের নেটওয়ার্কের যোগসাজশ পরিষ্কার হয়ে যায়৷stamp

ওসামা বিন লাদেন এবং আল-কায়েদার বিরুদ্ধে আমেরিকা যখন যুদ্ধ শুরু করে, তখনই পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ সহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলায় লাদেনের ব্ক্তৃতা ও ছবি সংবলিত প্রচুর ইস্তাহার, ক্যাসেট, সিডি বিলি হওয়ার প্রমাণ মেলে৷শুধু তাই নয়, প্রায় একই সময়ে বিভিন্ন জেলার এলাকায় এলাকায় গজিয়ে ওঠে বহু অনথিভুক্ত মাদ্রাসা৷সেইসব মাদ্রাসায় পড়ুয়াদের অক্ষর পরিচয় করানো হত এমন ভাষায়—‘ম-এ মুজাহিদ এগিয়ে চলে৷’ ওই সময়েই জনগণনা রিপোর্টে প্রকাশ পায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য৷পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে তো বটেই, এমনকী তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতেও (যেমন বর্ধমান, বীরভূম) মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ক’ বছরে লাফ মেরে বেড়ে গিয়েছে৷অনুপ্রবেশই যে এর প্রধান কারণ সে কথা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়৷তখন এও বলা হয় যে, এ ব্যাপারে রাজ্য প্রশাসন অদ্ভুতভাবে উদাসীন৷খাগড়াগড়ের ঘটনাতেও কি সেই ধারাবাহিক উদাসীনতারই পরিচয় মেলে না?

- Advertisement -

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজ্য জঙ্গি তৎপরতার একটা বড় ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে৷ বিশেষ করে যবে থেকে জম্মু-কাশ্মীর সীমান্ত দিয়ে পাক সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর ভারতের মাটিতে জঙ্গি চালানের অপারেশন ধাক্কা খেয়েছে, তার পর থেকেই পশ্চিমবাংলার মাটি হয়ে ওঠে তাদের সব চাইতে পছন্দসই ট্রানজিট রুট৷শুধু জঙ্গিবাহিনী নয়, অস্ত্রশস্ত্র সহ জালনোট—সবই তখন ভায়া পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ থেকে চোরাপথে একনাগাড়ে ভারতে ঢুকেছে৷এই কারবার ফলাওভাবে চালাতে আই এস আই তখন তাদের অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার্স ঢাকায় সরিয়ে এনেছিল৷সেটা ছিল পারভেজ মুশারফের জমানা৷ আর বাংলাদেশের ক্ষমতায় তখন বেগম জিয়া৷

ঠিক সেই সময়েই শিয়ালদহ স্টেশনে মিলেছিল প্রচুর পরিমাণে আর ডি এক্স আর জিলেটিন স্টিক৷হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে হায়দরাবাদ, আগ্রা, বেনারস, দিল্লি, এমনকী কাশ্মীরে গিয়ে নাশকতা ঘটাচ্ছিল পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিরা৷আর কদিন অন্তর এ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে মিলছিল থরে থরে জালনোট৷

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে পালাবদলের পর এবং মূলত আমেরিকার চাপে সীমান্তপারের সেই তৎপরতার বিপদ অনেকটাই হ্রাস পায়৷কিন্তু তাই বলে এখানে কট্টরপন্থী জঙ্গিদের ক্রিয়াকলাপ ও তৎপরতা বন্ধ একেবারে হয়েছে কি? খাগড়াগড়ের ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু অন্য কথা বলছে৷এর আগে চিটফান্ডের টাকা বাংলাদেশের কট্টরপন্থীদের হস্তগত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ সেদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নির্দেশে সেখানকার বিদেশমন্ত্রী এদেশে এসে এ ব্যাপারে খোঁজখবর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছেন৷তার পর এবার খাগড়াগড় কাণ্ড৷রাজ্যের শাসকদলের স্থানীয় নেতার ঘরে আচমকা বিস্ফোরণ, সন্দেহভাজনদের মৃত্যু, আল-কায়েদা প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির নামাঙ্কিত ইস্তাহার, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর ভারতীয় নাগরিক বনে যাওয়া, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের নাম ভেসে ওঠা—সব মিলিয়ে কোথাকার জল কোথায় গড়াবে কে জানে!

 প্রতিবেদন: নিখিলেশ রায়চৌধুরী ৷৷ কলকাতা

—————————————————————————————————————————————-

Advertisement ---
---
-----