চিটফান্ডকে কখনই আশকারা দিতে চাইতেন না বরুণ সেনগুপ্ত

চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্তে নেমে এ রাজ্যের পাঁচটি নামী সংবাদমাধ্যমকে নোটিশ পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই)৷ চিটফান্ডের কত টাকার বিজ্ঞাপন কোথায় কী হারে বেরিয়েছে, সেটাই আসলে খুঁজে বের করা সিবিআইয়ের উদ্দেশ্য৷ সেইসঙ্গে তারা খতিয়ে দেখতে চায়, এইসব বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে বিজ্ঞাপনগ্রহীতাদের এব্যাপারে বিশেষ কোনও সমঝোতা হয়েছিল কি না, অর্থাৎ বিজ্ঞাপন নেওয়ার প্রচলিত নিয়ম অতিক্রম করে উভয়ের মধ্যে আলাদা কোনও সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল কি না৷
প্রসঙ্গত, সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে একের পর এক অভিযোগের তিরে যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার নাজেহাল, সেই সময় তাদের তরফ থেকেও দাবি জানানো হয়েছিল–বিভিন্ন নামকরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে চিটফান্ডগুলির কাজকারবারের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হোক৷ তাহলে নাকি অনেক গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাবে৷ সেই দাবি বিবেচনা করেই হোক বা না হোক, বিষয়টি যে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের গোচরে আছে, এই নোটিশ পাঠানো থেকে তা বোঝা গেল৷ বিশেষ করে যেখানে চিটফান্ডের টাকার সঙ্গে এখন জঙ্গি যোগাযোগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, এমনকী জঙ্গি কার্যকলাপে সহায়তার জন্য সেই টাকা ভিন দেশে পর্যন্ত চালান হয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে, সেখানে সন্দেহজনক কোনও সূত্রই যে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা হাতছাড়া করতে চাইছেন না, সেটা তাঁদের এই নোটিশ পাঠানো থেকে পরিষ্কার৷
দুঃখের বিষয় এটাই যে, কেন্দ্র-রাজ্য দুই জবরদস্ত নজরদারেরই নাকের ডগায় চিটফান্ডগুলি যখন তাদের রমরমা কারবার চালায়, তখন ঠগ-জোচ্চোরের বদলে তারা ‘মানি মার্কেটে’র আখ্যা পেয়ে যায়৷ আর সেই সময় অনেকেই তাদের হিসাব-বহির্ভূত টাকার স্রোত নিজের কোলে টানতে কোনও নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না৷ তা সে দলীয় ফান্ডের অনুদান হিসাবেই হোক, কিংবা বিজ্ঞাপনের আয়ের নিরিখেই হোক৷
এই সময়ে খুব বেশি করে মনে পড়ছে স্বনামধন্য সাংবাদিক তথা ‘বর্তমান’ সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্তর কথা৷ কাছ থেকে দেখেছি, বরুণদা চিটফান্ডের বিজ্ঞাপন নেওয়ার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন৷ তিনি কখনই চিটফান্ডের কোনও বিজ্ঞাপন নিতে চাইতেন না, তা সে যত লক্ষ-কোটি টাকারই হোক না কেন৷ বার বার বলতেন, মানুষকে ঠকানোর জন্যই এই ধরনের সংস্থা গজিয়ে ওঠে৷ তাই এইসব সংস্থার বিজ্ঞাপন নেওয়ার অর্থ কার্যত এদের অনৈতিক কাজ-কারবারেই মদত জোগানো৷
আজ থেকে বছর বিশেক আগে সদ্য চালু হওয়া ‘সংবাদ প্রতিদিন’ ছেড়ে আমি একটি চিটফান্ড কোম্পানির সংবাদপত্রে যোগ দিই৷ বছরখানেকের মধ্যে সংবাদপত্রটি বন্ধ হয়ে যায়৷ পরে এজন্য একাধিকবার বরুণদার বকুনি খেয়েছি৷ বলতেন, ‘এ থেকেই বোঝা যায়, তোমাদের কোনও ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান নেই৷’ এ রাজ্যে চিটফান্ডের ফলাও কারবার সম্পর্কে তিনি পাঠকদের বহুবার হুঁশিয়ার করেছেন৷ খেদের সঙ্গে বলতেন, ‘বাঙালি মনে করে ভারতের সব কটা জাতের মধ্যে তার বুদ্ধি সব থেকে বেশি, কিন্তু এখানে চিটফান্ডের রমরমাতেও বোঝা যায়— বাঙালির আই কিউ সব থেকে কম৷’
আজ যখন চিটফান্ড কেলেঙ্কারির সূত্রে পাঁচটি নামী সংবাদমাধ্যমকে সিবিআই নোটিশ পাঠিয়েছে বলে খবরে প্রকাশ, তখন বরুণদা-র কথাই আরও বেশি করে মনে পড়ছে৷ সেইসঙ্গে এটাও ভুলতে পারছি না যে, চিটফান্ডের লক্ষ লক্ষ টাকার বিজ্ঞাপন তিনি কত ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতেন৷

প্রতিবেদন: নিখিলেশ রায়চৌধুরী

————————————————————————————————————————————————————

Advertisement
----
-----