চিটফান্ড এক অদ্ভুত কারবার৷প্রতি দশ বছর অন্তর এর বোলবোলাও  হয়৷বাজারে এন্তার টাকা ওড়ে৷তারপর কোনও না কোনও কেলেঙ্কারির ফাঁসে শুরু হয় ‘ধর ধর ওই চোর ওই চোর’পালা৷ দেখতে দেখেতে বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা গায়েব৷লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্বান্ত৷ মজা হচ্ছে, যখন এই চিটফান্ডগুলি রমরমিয়ে চলে তখন সাধারণের মুখে মুখে সেগুলির কথা ফিরলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের তাবড় মাথা তা নিয়ে ঘামান না৷ তখন তারা রিজার্ভ ব্যাংক থেকে সেবি-কারও নজরেই আসে না৷যেন সব বায়বীয় পদার্থ, চোখ দেখা যায় না, হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় না৷ কোনও একটা ফাঁসলে তবেই জানা যায়,অমুক লক্ষ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে, তমুকের হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব মেলেনি ইত্যাদি ইত্যাদি৷শুরু হয় হইচই, থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি, রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় স্তরে গোয়েন্দাদের হানটান, একে গ্রেফতার তো তাকে দফায় দফায় জেরা৷ ‘জেল ভরো’য় তখন শশব্যস্ত প্রশাসন৷ মাঝখান থেকে টাকাগুলো কোথায় লুকোয় কে জানে! কিছুদিন বুক-কপাল চাপড়াচাপড়ি, তারপর ক্রমে উত্তেজনা থিতিয়ে আসে, একটা সময় মনে হয়-চিটফান্ড বলে কোনও কিছু ছিলই না৷  এইভাবে আট-দশ বছর কেটে গেলে দেখা যায়-আবারও তা মাথা চাড়া দিয়েছে৷ নতুন নামে, নতুন চেহারায়৷ কিন্তু কাজ সেই একই পাবলিকের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে লার্জস্কেলে ফুলেফেঁপে ওঠা৷
চিটফান্ডের সঙ্গে রাজনীতির কারবারিদের প্রেমালাপও  নতুন কোনও ব্যাপার নয়৷বাস্তবিক,  সেই অভিসারের জায়গাটা পোক্ত থাকে বলেই রাজ্যে চিটফান্ডের বাড়বাড়ন্ত ঘটে৷ রাজনৈতিক দল চালাতে লাগে জলের মত টাকা৷  ক্ষমতায় থাকলে সেই টাকার খাঁই আরও বেড়ে যায়৷ক্ষমতা বড় বিচিত্র জিনিস৷ মাঠে-বাদাড়ে চরা হাড়-জিরজিরে ছাগলেরও তখন বাছুর সাইজের পাটনাই পাঁঠার চেকনাই  এসে যায়৷ এই জেল্লা আসে হিসাব-বহির্ভূত অঢেল পয়সায়, আর কারবার বজায় রাখতে তা অকাতরে বিলোতে পারে প্রধানত চিটফান্ডগুলি৷ অন্য রাজ্যের কথা না হয় মুলতুবি রাখা গেল, এ রাজ্যের প্রসঙ্গে বলা যায়, পাবলিকের পকেট কাটা ‘এই মারি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার’-এর বখরা সব রাজনৈতিক দলই পেয়েছে৷কেউ কম, কেউ বেশি, আর ক্ষমতায় থাকলে অনেক অনেক বেশি৷
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মুশকিল হল, ভয় ভাঙা ভোটের বিপুল জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে এরা ক্ষমতায় এসেছে বটে, কিন্তু গদিতে ওঠবস করানো টাকার থলিগুলো লুকিয়ে  ফেলার কায়দাটা ঠিকঠাক রপ্ত করতে পারেনি৷ আর সে কারণেই এই মুহূর্তে প্রতিপদে তাদের অপদস্থ হতে হচ্ছে৷ কোনও ভাবেই যেন আর পারা লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না৷ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মিডিয়াকে দুষছেন, কিন্তু তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই৷ মিডিয়ার কাজ মিডিয়া করবে৷ মুখ্যমন্ত্রী নিজেও  কি দাবি করতে পারেন যে, মিডিয়াকে তাঁর দরকার নেই?
কালো টাকা সাদা করার কিংবা সেই টাকা ‘চোট’ করার হরেক রকম পন্থা আছে৷ আগে যারা এই রাজ্যের প্রধান শাসকদল ছিল, সেই সিপিএমের এক্ষেত্রে একটা নিপুণ দক্ষতা ছিল৷ তাদের আমলেই ‘সঞ্চয়িতা’, ‘ভেরোনা’ থেকে শুরু করে একের পর এক পেল্লায় সাইজের চিটফান্ড কেলেঙ্কারি ঘটেছে বস্তুত, সারদার বাড়বৃদ্ধিও মূলত তাদের আমলেই ঘটেছিল৷ সেই আমলের কর্তারা কি এসব বাড়তে দিয়েছিলেন বিনা কামাইবাজিতে? পয়দাগিরিতে সিপিএম জমানার সঙ্গে এই আমলের কর্তাব্যক্তিদের ফারাক একটা জায়গাতেই৷এঁদের হজম শক্তি কম৷ মানে, কতটা হজম করতে পারব তা না বুঝেই ক্ষমতায় বসতে না বসতেই এঁরা দুবেলা বিরিয়ানি সাবাড় করতে উঠেপড়ে লেগে যান৷ ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে৷ নানা দিক থেকে বিরিয়ানির গন্ধ নাকে এসে লাগছে৷
বহুকাল আগে কিংবদন্তিসম সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত তাঁর অনবদ্য কলমে লিখেছিলেন, এক কড়া দুধ থাকলে কংগ্রেসিরা সেই দুধের কড়ায় নেমে পড়ে, সবাই দেখতে পায় তারা দুধ খেয়েছে৷ আর সিপিএম সেই কড়ার তলায় একটা ফুটো করে পাইপ লাগিয়ে পুরো দুধটা টেনে নেয়, কেই কিচ্ছুটি বুঝতে পারে না৷ সিপিএম আমলেই এ রাজ্যে যত মানুষের প্রভিডেন্ট ফান্ড মার গিয়েছে তার তুলনা দেশের আর কোনও রাজ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে না৷ কিন্তু তা নিয়ে কেউ কোনও  উচ্চবাচ্য আর করে না৷ অথচ এই মুহূর্তে সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে যা চলছে তাতে বোধ হচ্ছে-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা দল গড়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস বরুণ সেনগুপ্ত কথিত সেই কংগ্রেসের লিগ্যাসিই ধরেছে৷
কথায় বলা হয় বটে, সত্য একদিন দিনের আলোর মত প্রকাশ পাবে৷ কিন্তু বাস্তব বলে, অনেক সত্যই সাধারণের নাগালে আসে না৷ সেই কারণেই  চিটফান্ড কেলেঙ্কারির মূল রহস্যগুলি কোনওদিনই সবিস্তারে জানা যাবে কিনা, সেটাই লক্ষ-কোটি টাকার প্রশ্ন৷

অতিথি লেখক: নিখিলেশ রায়চৌধুরি ৷৷ প্রাক্তন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর-বর্তমান পত্রিকা

Advertisement

——————————————————————————————————————

----
--