চিনাদের জন্য পালটা দাওয়াইয়ে মিশে গেল গঙ্গা-মেকং

চিনা প্রেসিডেন্টের পর দুদিনের ভারত সফরে এসে, এদেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখতেই এক নতুন উত্তেজনার খোরাক জুগিয়ে দিলেন ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী নগুয়েন তান দুং৷ দুই দেশের সম্পর্ক আজকের নয়৷ প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম স্তম্ভ চম্পা রাজ্য গড়ে উঠেছিল আজকের ভিয়েতনামের মাটিতেই৷ তাছাড়া, আধুনিককালে হোচিমিনের সময় থেকে কমিউনিস্ট দেশ ভিয়েতনামের সঙ্গে স্বাধীন ভারতের যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে, আজ পর্যন্ত তাতে এতটুকু টোল খায়নি৷ ভাবলে আশ্চর্য লাগে, তিন-তিন বাঘা শক্তিকে শায়েস্তা করে ছেড়েছে ওইটুকু দেশ৷ প্রথমে ফ্রান্সকে, তার পর আমেরিকাকে, অতঃপর লালচিনকে৷
২০০৫ সালে ‘বর্তমানে’র প্রতিনিধি হিসাবে সেদেশের রাজধানী হ্যানয়ে গিয়ে দেখেছি, এদেশের মতো সস্তা চিনা পণ্যে সেদেশের বাজারও ছেয়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু ভারতের প্রতি ভিয়েতনামের সরকার থেকে সাধারণ মানুষ, কারওরই উষ্ণতায় এতটুকু ভাটা পড়েনি৷ ব্যস্ত রাস্তায় দু’ চাকা থামিয়ে যেচে আলাপ করেছে উজ্জ্বল তরুণ, দেখেই বুঝতে পেরেছে ‘আনদো’ (ইন্ডিয়ান)৷ লালচিনের উপর সেখানকার মানুষের রাগ এত প্রবল যে, কিছু দিন আগে চিনাদের প্রতিষ্ঠান ভেবে তারা অন্য দেশের সংস্থায় হামলা চালিয়েছিল, সে ঘটনায় বেশ কয়েকজন হতাহতও হয়৷
খুব স্বাভাবিকভাবেই চিনের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নে ভিয়েতনাম যে তার পুরানা দোস্ত ভারতেরই পাশে থাকবে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই৷ অস্বীকার করার নেই যে, লালচিনের সঙ্গে ইদানীং ভারতের সম্পর্ক আগের চাইতে অনেক ভালো হয়েছে৷ অভ্যন্তরীণভাবে চিনও বদলে গিয়েছে অকল্পনীয় গতিতে৷ তা বলে ভূরাজনীতি তথা আঞ্চলিক প্রভাববিস্তারের প্রশ্নে চিনের বরাবরের আগ্রাসী মনোভাবে এতটুকু পরিবর্তন ঘটেনি৷ এ ব্যাপারে মাও সে তুংয়ের সঙ্গে জি জিনপিংয়ের কোনও তফাত নেই৷ চিন এখনও মনে করে, তারাই বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু৷ অতএব এই দুনিয়ার উপর একচ্ছত্র অধিকার কায়েমের অধিকারী কেবলমাত্র তারাই৷ আর এশিয়া, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তো তাদের খাস জায়গির৷ কিন্তু হালে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের এই উচ্চাভিলাষ পূরণের পথে একদিকে যেমন ভারত একটা বড় কাঁটা, ঠিক তেমনই চিন সমুদ্র এলাকায় আর এক কাঁটা হল এই ভিয়েতনাম৷ স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের ঝগড়া এখনও মেটেনি এবং এ ব্যাপারে চিনের চোখরাঙানি ভিয়েতনাম কোনও দিন বরদাস্ত করেনি৷ বস্তুত, ১৯৭৯ সালে লালচিন যে ভিয়েতনামের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার পিছনেও প্রধানত ছিল এই বচসা৷ ভিয়েতনামের পালটা মারে চিন সেদিন পিঠটান দিতে বাধ্য হয়েছিল৷
নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর ভারত ঠিক করেছে, প্রাচীন যুগে ভারতের সভ্যতা-সংস্কৃতি সমুদ্রপথে যেসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, অর্থাৎ সেই কম্বোজ, চম্পা, যবদ্বীপ সহ বিশাল এলাকা জুড়ে যে দ্বীপ-বদ্বীপময় সমুদ্র তল্লাট, সেখানে ভারতের তরফে আবার নতুন করে এক রণনৈতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলা হবে৷ সোজা কথায়, প্রতিরক্ষার খাতিরে চিনের উগ্রতাবাদী ঝোঁকের জবাবে আর শুধু শান্তির বাণীতেই আটকে থাকতে চাইছে না ভারত, সেও এবার পালটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে চায়৷ সেই পদক্ষেপেরই একটি বড় সূত্রপাত ঘটল ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের মধ্য দিয়ে৷ সমুদ্রসীমান্তে টহলদারি চালানোর জন্য ভারত ভিয়েতনামকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামরিক পেট্রল বোট দিচ্ছে৷ আর তারই সূত্রে ভারতীয় নৌবাহিনীকে দক্ষিণ চিন সমুদ্রে প্রবেশ করার জন্য সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী৷ বলা বাহুল্য, বেজিং এর ঘোরতর বিরোধী৷
চিনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে দু’ দেশের সম্পর্ক আরও মজবুত করার অনেক শপথ নেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু তাতে চিনা ড্রাগনের উদ্যত থাবা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিত্রাণ মেলার সম্ভাবনা নেই৷ এই দফার অ্যাপেক (এশিয়ান-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন) শীর্ষ সম্মেলন বসছে বেজিংয়ে৷ সদস্য না হলেও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে মোদীর ভারত তাতে আমন্ত্রিত হিসাবে যোগ দেবে৷ তার আগে ভিয়েতনামের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই নয়া সামরিক সমীকরণ চিনের কপালে ভাঁজ ফেলবেই৷ কিন্তু বান্দুং সম্মেলনে নেহরুর সহায়তায় আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পেয়েও অকৃতজ্ঞ মাও সে তুং ও তাঁর চ্যালা চৌ এন লাই ভারতকে যেভাবে হতমান ও লাঞ্ছিত করেছিলেন, সেই রোগের পালটা দাওয়াইয়ের কথা কিছুটা হলেও ভারত যদি এত দিন বাদে ভেবে থাকে এবং এই উদ্যোগে ভিয়েতনামের মতো বন্ধু দেশ যদি নৈতিক ও বাস্তবিক সমর্থন জানায়, তাহলে তার চাইতে আনন্দের বিষয় আর কীই বা হতে পারে!

প্রতিবেদন: নিখিলেশ রায়চৌধুরী