জনপ্রতিনিধিদের ভাষণে আইনি লাগাম প্রয়োজন

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কতদূর কু-কথা বলতে পারেন?
না, এর কোন গাইড লাইন দেশের সংবিধানে নেই। তবে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পর এসব নিয়েও ভাবার সময় এসেছে। দলের নেতানেত্রীদের খুশি করতে হলে, জনাকয়েক জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যে যেভাবে কুরুচিকর কথা বলে চলেছেন, তাতে সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির মর্যাদা সরাসরিভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতা বা নেত্রীরা যখন এসব শুনেও মুখ বুজে থাকেন, এমনকী বাহবাও দেন, তখন এসব থামাতেও কী কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হবে?

অবাক লাগে, তৃণমূল কংগ্রেসের যেসব নেতানেত্রী একদিন সিপিএমের বিমান বসু, অনিল বসু, আনিসুর রহমানদের কুরুচিকর কথার তীব্র প্রতিবাদ করে গলা ফাটিয়েছেন, তাঁরাও আজ চুপ করে নিজের দলের কিছু নেতার এইসব কথা মেনে নিচ্ছেন৷ স্রেফ শীর্ষ মহলের নেকনজরে থাকার জন্য। যে নেতারা একদিন এই ধরণের কথাবার্তাকে নীতিহীন, অশালীন, মর্যাদাহানিকর, কুরুচিকর বলে গলা ফাটিয়ে হাততালি কুড়িয়েছেন, তাঁদের অনেকেই আজ সেই একই কথা জোরের সঙ্গে উচ্চারণ করে দলে বাড়তি গুরুত্ব পেতে চাইছেন। কী অসহ্য! বিরোধী দল থেকে সরকারি দলে রূপান্তরিত হলে কী নিজেদের নীতিজ্ঞানও বদলে যায়?

তৃণমূলের এক সাংসদ, আইনজীবী হিসেবেও যিনি সমধিক পরিচিত, শনিবার এক নির্বাচনী সভামঞ্চে রীতিমতো নাচ করতে করতে রাজ্য নির্বাচন কমিশন এবং কমিশনার প্রধান মীরা পান্ডেকেও অশলীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন। পাড়ার রকে সাধারণভাবে যে ভাষায় কথা বলা হয়, দলনেত্রীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই ভাষাতে নেচে কুঁদে অনেক কথা সেই সাংসদ বললেন।  তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যেন হার মানাল বিশেষ পাড়ার বাসিন্দাদেরও। আসলে যাঁর যা কালচার, সেটাকে আঁকড়ে ধরেই মাথাখাঁড়া করতে চাণ। এটা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ওই সাংসদও তাই করেছেন, যা তাঁর কালচার, রুচির সঙ্গে খাপ খায়। প্রশ্ন অনেক উঠেছে আজ। নিজের সাংসদ মুখোশের আড়ালে যে মুখ লুকিয়ে আছে, সেটা যদি কেউ বাইরে আনতে চায়, আনতেই পারে।

- Advertisement -

কিন্তু, কে সেই সাংসদকে অধিকার দিয়েছেন সাংবিধানিক এক প্রতিষ্ঠানকে অপমান করার? সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক কথা বলার? বক্তা যদি সাধারণ কর্মী বা নেতা হতেন, তাহলে হয়তো উপেক্ষা করা যেত। কিন্তু, গোল বাঁধাচ্ছে অন্যখানে। যে পবিত্র ভবনে দেশের আইন তৈরি হয়, আইন তৈরির ব্যাপারে যিনি ওই ভবনের একজন সদস্য হিসেবে নিজের মতামত দিতে পারেন, সেই ব্যক্তি যদি সংবিধানকে অপমান করেন, তাহলে প্রশ্ন জাগে বইকি৷ যে সেই ‘বক্তা’কে আর সংসদের সদস্য রাখা উচিত হচ্ছে কী না? শুধু এই সাংসদ নন, রাজ্যের একাধিক মন্ত্রী, বিধায়কও টানা প্রায় তিন মাস এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মাথায় রাখতে হবে এদের কথাও।সাংসদীয় রাজনীতিকে অপরাধমুক্ত করতে সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়-ই জানিয়ে দিয়েছে, জেলে থেকে আর প্রার্থী হওয়া যাবে না। এতদিন কেউ ভাবতে পারেনি যে, এই ধরনের কোন রায় সুপ্রিম কোর্ট দিতে পারে। কিন্তু, সেটা হয়েছে। তাই এবার ভাবতে হবে, যে সব এমপি, এমএলএ’রা প্রকাশ্যে সংবিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অপমান করবে, মর্যাদাহানি করবেন, তাঁদের সদস্য পদ দ্রুত খারিজ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল।

আজ বা কাল এই আইন হবেই। অপেক্ষা শুধু সময়ের এবং সুপ্রিম কোর্টে এই দাবি নিয়ে মামলা করার। আজ যে বা যাঁরা দলের নেত্রী বা নেতা খুশি করতে, স্তাবক হিসেবে এক নম্বর হতে সচেতনভাবে এই কাজ করছেন, তাঁদের আর এক মুহুর্তও সাংসদ, বিধায়ক থাকাটা আসলে আমাদের অপমান, দেশের অপমান, সংবিধানের অপমান, আইনসভার অপমান।

এইসব অযোগ্য, দলদাস, নীতিহীন লোকজনদের আর এক সেকেন্ডও আমাদের মাথায় থাকতে দেওয়া যায় না। টেনে নামাতেই হবে তাঁদের।

* লেখক: বশিষ্ঠ দাসশর্মা

Advertisement
---