তৃণমূলে গোষ্ঠীবাজির গপ্পো ধোপে টেঁকেনি

ভোটের আগে একটা হিড়িক উঠে গিয়েছিল, ব্যাপক গোষ্ঠীবাজিতে জর্জরিত তৃণমূল৷ ভোটে তার একটা বিরাট প্রভাব পড়বে৷ উঠে গিয়েছিল ঠিক বলব না, পরিকল্পিতভাবে তুলে দেওয়া হয়েছিল৷ যে যে কারণে তৃণমূল কংগ্রেস এবার ক্ষমতায় আসতে পারবে না বলে মনে করছিলেন অনেকে, তার মধ্যে একটা এই গোষ্ঠীবাজি৷ কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তৃণমূলের ভোটে গোষ্ঠীবাজির কোনও প্রভাব পড়েনি৷ একেবারে পড়েনি বলব না৷ খুব সামান্য দু’-তিনটি জায়গায় গোষ্ঠীবাজি কাজ করেছে বটে, তবে সেখানকার নায়করা হয় গোঁয়ার, নয় ব্যক্তিগতভাবে একটু হলেও কিছু করার ক্ষমতা রাখে৷ সেসব অবশ্য এই ভোটে কোনও ফ্যাকটর হয়ে ওঠেনি৷ যতখানি ভাবা হয়েছিল বা প্রচার করা হয়েছিল, তার ২৫ শতাংশও যদি এফেক্ট পড়ত, তাহলে তৃণমূলের আসন সংখ্যা একধাক্কায় অনেকটা কমে যেত৷

অশোক বসু
অশোক বসু

রাজনীতিতে এখন গোষ্ঠীবাজি নেই, এটা ভাবাই যায় না৷ আসলে রাজনীতি এখন বেশিরভাগের কাছে কামিয়ে নেওয়ার পেশা৷ ধান্দাবাজির জন্য কেউ একচিলতে জমি ছাড়তে রাজি নয়৷ এলাকার মধ্যেই পাওয়া আর না-পাওয়ার গোষ্ঠীবাজি তো বহু দিন ধরেই চলছে৷ সিপিএমের আমলেও চলত, এখনও চলছে৷ কিন্তু এই গোষ্ঠীবাজরাও জানে, ধান্দাপানি করতে গেলেও শাসকদলেই থাকতে হবে৷ যে কারণে যেদিন থেকে আভাস পাওয়া গিয়েছে, এ রাজ্যের রাজনীতিতে পট পরিবর্তন হতে চলেছে সেদিন থেকেই এই ধান্দাবাজরা জার্সি বদলাতে শুরু করেছে৷ যাদের একটু বেশি দূর দেখার ক্ষমতা আছে, তারা ২০০৮ সাল থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করে দেয়৷ আর যারা সাহস পায়নি, তারা ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরই রাতারাতি ঝাঁপ দেয় শাসক শিবিরে৷ সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে৷ এখন সেটাকেই অনেকে আপাতভাবে গোষ্ঠীবাজি বলে ধরে নেয়৷ তার ভিত্তিতেই অঙ্ক কষে৷

তৃণমূল কংগ্রেস সিপিএমের মতো রেজিমেন্টেড পার্টি নয়৷ তবে, এখন আর সিপিএমে সেই রেজিমেন্টেশন নেই৷ তৃণমূল কার্যত ওয়ান ম্যান পার্টি৷ একজনের হাতেই দলের নিয়ন্ত্রণ৷ তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তিনিও জানেন, তাঁর দলের মধ্যে ব্যাপক খেয়োখেয়ি রয়েছে৷ শক্ত হাতে হাল না ধরলে এই খেয়োখেয়ি ব্যাপক আকার নিতেই পারত৷ মমতা তা হতে দেননি৷ ভোটের আগে এমপি, এমএলএ থেকে পঞ্চায়েত স্তরের প্রতিনিধিদেরও সারকথা জানিয়ে দিয়েছিলেন, গদ্দারি করলে গর্দান যাবে৷ বলেছিলেন, আপনাকে অন্য জায়গার কথা ভাবতে হবে না৷ নিজের জায়গায় কনসেনট্রেট করুন৷ সেখান থেকে দলের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে হবে৷ সকলেই বুঝে গিয়েছিলেন, কী ইঙ্গিত করছেন তিনি৷ তাই বিরোধীরা, কিছু সংবাদ মাধ্যম ব্যাপকভাবে তৃণমূলের অন্তর্কলহের কথা বললেও ভোটে তার কোনও প্রভাব পড়েনি৷

- Advertisement -

ভোটের আগে শোনা গিয়েছিল, বর্ধমানে রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় এবং কাটোয়ায় রবি চট্টোপাধ্যায়কে হারানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে তৃণমূলেরই এক গোষ্ঠী৷ তাদের পিছনে নাকি কোনও কোনও মন্ত্রীরও মদত ছিল৷ কিন্তু ফল বেরতে দেখা গেল, কোথাওই তৃণমূলের গোষ্ঠীবাজির এফেক্ট পড়েনি৷ ওঁরা জিতেছেন৷ শুনেছিলাম, সিঙ্গুরে নাকি মাস্টারমশাই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে হারানোর বরাত নিয়েছেন বেচারাম মান্না৷ ভোটের দিন বেশ কিছু বুথে নাকি তৃণমূলের এজেন্টও ছিল না৷ শোনা গিয়েছিল, তার পিছনেও নাকি বেচারামের হাত রয়েছে৷ এমনিতেই বেচারাম মান্নার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর সম্পর্ক ভালো না৷ একসময় লড়ালড়িটা প্রকাশ্যেই এসে গিয়েছিল৷ বেচারাম মান্নার কাছে পদে পদে অপদস্থ হয়েছেন মাস্টারমশাই৷ ভোটের আগে এলাকায় ঘুরতে গিয়ে আমার কিন্তু কখনই মনে হয়নি, গোষ্ঠীবাজি তৃণমূলের ভোটে কোনও প্রভাব ফেলতে পারে৷ বরং অধিকাংশ সাধারণ মানুষ কিন্তু একবাক্যে বলেছেন, এখানে মাস্টারমশাই-ই জিতবেন৷ মাস্টারমশাই-ই জিতেছেন৷ অনেক জেলাতেই এই রকম ঘটনা ঘটেছে৷ বহু ক্ষেত্রেই পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, গোষ্ঠীবাজিতেই কাত হয়ে যাবে তৃণমূল৷ হয়নি৷

পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় এমনভাবে এই গোষ্ঠীবাজির কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে সাত-আটটিই হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে তৃণমূলের৷ হয়নি৷ গতবারে এই জেলার সব কটি আসন ছিল তৃণমূলের দখলে৷ এবার কিন্তু তিনটি আসন হাতছাড়া হয়েছে৷ হলদিয়া, পূর্ব পাঁশকুড়া, তমলুক৷ গোষ্ঠীবাজির জন্য যে আসনগুলি খোয়াতে পারত তৃণমূল, সেই আসনগুলিতে কিন্তু হারেনি৷ যেখানে হেরেছে সেখানে গোষ্ঠীবাজির চেয়ে অন্য ফ্যাকটরগুলোই কাজ করেছে বেশি৷

তবে, ভাঙড় কিংবা নানুরের মতো দু’-চারটি জায়গায় ভোটে প্রত্যক্ষ গোষ্ঠীবাজির প্রভাব কিছুটা হলেও পড়েছে৷ ভাঙড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সদ্য সিপিএম থেকে আগত চাষার ব্যাটা রেজ্জাক মোল্লাকে প্রার্থী করায় আরাবুল গোষ্ঠী যে এখানে তাঁর বিরোধিতা করবে, এটা জানা কথাই ছিল৷ আরাবুল নিজে ব্যাকফুটে৷ তার মধ্যেও রেজ্জাক মোল্লাকে হারানোর চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেনি৷ তিনি যাতে জিততে না পারেন, সেজন্য একটা নির্দল প্রার্থীও খাড়া করে দিয়েছিল আরাবুল৷ রেজ্জাক প্রকাশ্যে বলেছেন, আরাবুল তাঁকে জেতানোর জন্য তো নামেইনি, বরং হারানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে৷ কিন্তু তিনি আরাবুলের ভরসায় লড়তে নামেননি৷ এবং, জিতে দেখিয়ে দিয়েছেন, গোষ্ঠীবাজি ভাঙড়ের ভোটে কোনও ফ্যাকটর হয়নি৷ তবে, ফ্যাকটর হয়েছে নানুরে৷ অনুব্রত মণ্ডল বনাম কাজল শেখের লড়াইয়ে তৃণমূলের হাতছাড়া হয়েছে আসনটি৷ প্রকাশ্যে দলের প্রার্থীর বিরোধিতা করতে নেমেছিল কাজল শেখ৷ বীরভূমে ১১টি আসনের মধ্যে দুটি মাত্র তৃণমূল পায়নি৷ সেই দুটির মধ্যে একটি নানুর৷ এলাকায় কাজল শেখের ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে৷ তার কাছে দায়বদ্ধ, এমন প্রচুর লোক রয়েছে যাদের কাছে কাজল শেখের মুখের কথাই শেষ কথা৷ ভবিষ্যতে কী হবে, না ভেবেই কাজল শেখ তৃণমূলের বিরুদ্ধচারণ করেছে৷ এমন দৃষ্টান্ত আর কিন্তু খুব বেশি নেই৷ আবারও বলছি, থাকলে তৃণমূলের এই ফল হতে পারত না৷

যতই প্রচার করা হয়েছে, ব্যাপক গোষ্ঠীবাজিতে জর্জরিত তৃণমূল এবং তার প্রভাব ভোটে পড়বে, এমন গপ্পো কিন্তু ধোপে টেঁকেনি৷
(লেখক ‘বর্তমান’ পত্রিকার প্রাক্তন কার্যনির্বাহী সম্পাদক এবং ‘সংবাদ প্রতিদিনে’র প্রাক্তন সহযোগী সম্পাদক)

Advertisement ---
---
-----