স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: কারখানা বন্ধ থাকলেও, পাড়ায় পাড়ায় সিদ্ধিলাভ চাইছে বাঙালি৷ বাংলায় অন্য এক পরিবর্তনের ছবি৷ বছর তিনেক আগে রাজ্য থেকে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটেছে৷ ফলে পুজো আর্চাও বাড়ছে৷ দুর্গা বা কালী পুজো করে নয়, জীবনে সিদ্ধিলাভ করতে এবার বাঙালি  ভরসা করছে গণপতিকে৷ সাধারণত শারদোৎসবের ঠিক আগেই বাঙালি মেতে উঠত বিশ্বকর্মা পুজোতে৷ এবারে শারদোৎসবের প্রাক্কালে  বিশ্বকর্মার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে গণেশ৷
সংস্কৃত, তেলুগু, তামিল ও কন্নড় ভাষায় গণেশকে বিনায়ক বলা হয়। পুরাণ মতে গণেশ হর-পার্বতীর পুত্র।আর তাঁর বাহন মূলত মূষিক বা ইঁদুর। বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর রূপ নিয়ে নানা বর্ণনাও রয়েছে। কোথাও কোথাও সিংহকেও তাঁর বাহন হিসেবে দেখা যায়।তবে গজমুণ্ড মনুষ্যকার দেবতা হিসেবে তাঁকে পুজো করা হয়।গণেশ মানুষের বুদ্ধি, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। বলা হয়ে থাকে সকল কাজের আগে গণেশ স্মরণ বা পুজো করা মঙ্গলজনক এবং তা করলে কার্যে সিদ্ধি নিশ্চিত৷ganesh
তবে বহুদিন ধরেই বাঙালির কাছে সিদ্ধিদাতা কেমন যেন ব্রাত্য থেকেছেন৷ দুর্গা-কালী পুজো বাদ দিলে মূলত বাঙালি সরস্বতীর আরাধনায় ব্যস্ত থাকে ৷ দুর্গাপুজোর ঠিক পরেই পাড়ার ভাঙা প্যান্ডেলের একাংশে লক্ষ্মী পুজো হলেও তাতে জৌলুশের অভাব বড্ড চোখে পড়ে৷ এজন্যই প্রবাদ রয়েছে বাংলায় অবহেলিত লক্ষ্মী৷ অনেকের ধারণা লক্ষ্মী এখানে চঞ্চলা হওয়ায় আর্থিক দিক থেকে বেহাল দশা বাংলার৷ আগে শিল্পের অবস্থা যখন ভাল ছিল তখন বরং বিভিন্ন কারখানায় রমরমিয়ে চলত বিশ্বকর্মা পুজো৷ কিন্তু কারখানার দরজায় দরজায় তালা ঝোলায় এখন বিশ্বকর্মা পুজো গৌরব হারাচ্ছে৷ তবে গত কয়েক বছর ধরেই আস্তে আস্তে মুম্বই অনুকরণে পাড়ায় পাড়ায় গণেশদাদা প্রবেশ করেছেন৷ প্রবাদ ছিল- বাংলা আজ যা ভাবে বাকী ভারত কাল তা ভাবে৷ কিন্তু ক্রমশ পিছতে পিছতে বাঙালি আজ ভারতের অন্য অঞ্চলকে অনুকরণ করতে শুরু করেছে৷ ভিন রাজ্য থেকে এ রাজ্য আমদানি হয়েছে ধনতেরাস উৎসব৷ আগে ওই দিনে সোনা কেনার তেমন রেওয়াজ ছিল না বঙ্গদেশে৷ কিন্তু দেশের অন্য অঞ্চলকে অনুকরণ করে গত ৮-১০ বছর ধরে ওই দিনে ক্রমশ পাল্লা দিয়ে সোনা কিনতে নেমে পড়ে এখন বাঙালি৷ তেমনই ইদানিং ভিন রাজ্যের প্রভাবে বাংলায় গণেশ আসছেন৷
গণেশ পুজো যে বাড়ছে তা কুমোরটুলিতে গেলেই বোঝা যাবে৷ দুর্গা মূর্তি গড়ার কাজ আপাতত সরিয়ে রেখে গত কয়েকদিন ধরে শিল্পীরা গণেশ মূর্তি গড়ায় মন দিয়েছেন৷ শিল্পীরা জানিয়েছেন, গত তিন বছর ধরে গণেশ মূর্তি গড়ার চাপ বেড়েছে৷ শুধু তাই নয়, এখনও যা চল তাতে এবারে বিশ্বকর্মার চেয়ে গণেশ গড়ার বেশি অর্ডার পেয়েছেন শিল্পীরা৷ আগে হাতে গোনা কয়েকটি স্থানে অবাঙালিরা মিলে সাধারনত গণেশ পুজো করত৷ কিন্তু পরিবর্তনের কলকাতায় উন্নাসিক বাঙালিরাও আয়োজন করছে এখন এই পুজোর৷ সল্টলেকে গণেশ পুজোর বড় বড় হোডিং বুঝিয়ে দিচ্ছে বাঙালির কাছে এখন আদৌ ব্রাত্য নয় দুর্গার বড় ছেলেটি ৷
হিন্দু পঞ্জিকা মতে, ভাদ্রমাসে শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গণেশের পূজা হয়। সাধারণত ২০ অগষ্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বের মধ্যে এই দিনটি পড়ে। এই পুজোকে ঘিরে দশদিনব্যাপী গণেশ উৎসবের সমাপ্তি হয় অনন্ত চতুর্দশীর দিনে।ভারতের বাইরে নেপালে এবং শ্রীলঙ্কার তামিল হিন্দুরাও গণেশ পুজো করে থাকেন। দেশের ভিতর এই উৎসব মূলত মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাট, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে পালন করা হয়। তবে মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজো জাতীয় উৎসব রূপে পালন করা হয়। প্রথমে মহারাষ্ট্রে এই উৎসব পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা বিস্তার করে। প্রসঙ্গত, ১৮৯৩ সালে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক এই উৎসবকে মহারাষ্ট্রের এক জাতীয় উৎসবে পরিণত করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুধর্মের জাতিভেদের সংকীর্ণতা দূর করে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয় আন্দোলনকে সুসংবদ্ধ ও সংগঠিত করা। তিলকই প্রথম বারোয়ারি মণ্ডপে গণেশ প্রতিমা স্থাপন করেন ও দশদিন বাদে গণেশ বিসর্জনের প্রথার সূচনা করেন। আগে এ রাজ্যে অ-কমিউনিস্ট নেতারা জন সংযোগের জন্য সাধারনত দুর্গা-কালী পুজোর আয়োজন করতেন৷ বর্তমানে রাজ্যে যে প্রবণতা তাতে  কংগ্রেস, বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা জন সংযোগের জন্য কয়েক বছরের মধ্যেই গনেশকে আঁকড়ে ধরলে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷

প্রতিবেদন: সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় ৷৷ কলকাতা

Advertisement

—————————————————————————————————————————————————————–

----
--