মেগাপুজোর মাথায় কালো মেঘ

পুজোর বাকি নেই তিন মাসও। কিন্তু এই শহর এখনও তেমন ব্যস্ত কোথায়? অন্য বছর এই সময় মেগা পুজোর কর্তাদের দৌড়ঝাঁপ যতখানি ছিল, এবার তা কই? কেমন যেন নীরবেই বাঙালির সেরা উৎসব আমাদের দরজার গোড়ায়। হঠাৎ কী এমন ঘটল? মেগা পুজোর মাথায় কী কালো মেঘ জমা হচ্ছে?

কলকাতার মেগাপুজোর অধিকাংশই কোন না কোন রাজনৈতিক নেতার পুজো বলে পরিচিত। কমিউনিস্টরা সরাসরি এইসব পুজো-টুজোতে বিশ্বাসী নন। তাই, টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকলেও সিপিএম বা বামফ্রন্টের কোন নেতা কোন পুজোকে ‘নিজের’ পুজো বানিয়ে, সেই পুজোকে ফাইভ স্টারে বানিয়ে তোলার চেষ্টাই করেননি। এই পুজোর ব্যাপারে তাই একা ‘রাজত্ব’ করে চলেছেন তৃণমূল বা কংগ্রেস নেতারা।

এই মুহুর্তে কলকাতার সব বড় পুজোর পেছনে আছেন তৃণমূলের কোন না কোন মন্ত্রী বা নেতা। সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের মতো হাতেগোনা ২/৪ টি পুজোর প্রধান কর্তা কোন কংগ্রেস নেতা। মহাকরণে পালা বদলের পর এই শহরে হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে মন্ত্রী বা হেভিওয়েট নেতার সংখ্যা। তাঁরাও কম যাবেন কেন। তাই তিন-চার বছর আগেও যেসব পুজো ছিল নেহাতই পাড়ার পুজো, তা এখন ডাল-পালা মেলে মেগা পুজোর স্ট্যাম্প গায়ে লাগিয়ে নিয়েছে। পুজো কমিটির মাথায় শাসকদলের কোন নেতা বা মন্ত্রীকে রাখতে পারলে স্পনসরশিপ ভালো মেলে, মোটা টাকা আসে। তাই, বছর দুই ধরে কলকাতায় তথাকথিত বড় পুজো বেড়ে গিয়েছে। আর বড় পুজোগুলো আরও বড় হয়েছে। কারণ একটাই। মন্ত্রী-নেতা থাকলে ‌’মাল’ মোটা আসে। ঝাঁ-চকচকে পুজো করে শহরে তাক লাগিয়ে দেন পুজোর পলিটিক্যাল কর্তারা। নেতা-মন্ত্রীদের কাছে পুজোর টাকা যোগাড় করা কোন সমস্যাই ছিল না। তাই ক্রমশই বড় হয়েছে হেভি-ওয়েট মন্ত্রী, নেতাদের পুজো। প্রায় শতাধিক মেগা পুজোর আকাশে এবার কিছুটা হলেও কালো মেঘ।

- Advertisement -

কোন চিন্তা ছিল না গত বছরও। চলেছিল সব ঠিকঠাক। এবার কিছুটা ভাটা। সেইসব মেগা পুজোর কর্তাদের কপালে ভাঁজ। এত টাকা কোথা থেকে আসবে? তাহলে কী এবার পুজো কিছুটা ছোট হয়ে যাবে? সব বড় বিশ্রী ব্যাপার। লোকজন বলবে কী, পাড়ায় তো আজ ইজ্জত থাকবে না। ইমেজ সচেতন কর্তাদের ঘুম এবার ছুটে গিয়েছে টাকা যোগাড় করতে। বাজেট, প্রত্যাশা বাড়লেও টাকার অভাব অনেক প্ল্যানই ছাঁটতে হচ্ছে এবার। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

মেগা পুজোর পলিটিক্যাল কর্তারা স্বীকার করুন বা নাই করুন, এটা মেনে নেওয়াই ভালো যে, এইসব পুজোকে আরও বড় করার পেছনে ছিল চিটফান্ড কর্তাদের ঢালাও সহযোগিতা। বড় পুজোকে আরও বড় করতে উদ্যোক্তাদের অনুরোধে চিটফান্ড কর্তারা তাঁদের পুজোকে মোটা টাকায় স্পনসর  করেছে। লাখ লাখ লোক এসেছে গোটা রাজ্য থেকে। লোকের মুখে মুখে ছড়িয়েছে পুজোর বিশালতার কথা। এবার পুজোর পাশে চিটফান্ড নেই। সারদার পাশাপাশি আরও ২০/২২ টা ছোট-বড় চিটফান্ড প্রকাশ্যে-গোপনে মেগা পুজোর কর্তাদের সঙ্গে ছিল। আর তারা নেই। তাই লাখ লাখ টাকাও নেই। পুজোবাজেটে এই ঘাটতি মেটানোর কোন রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। বাজেটে টান, কপালে হাত। এই পরিস্থিতিতে মেগাপুজোর জৌলুস থাকবে কী করে, সেই ভাবনায় অস্থির পুজো কর্তারা। পুজো প্রায় দোরগোড়ায় এসে গেলেও, সুরাহার পথ এখনও মেলেনি। এই বিশাল ‘গ্যাপ’ মেটাতে এখনও কোন ‘বিগ হাউস’ তেমন সাড়া দেয়নি।

তাই, মেগাপুজোর মাথায় কালো মেঘ। এই মেঘ যদি বৃষ্টি হয়ে নামে, তাহলে এবারের শারদীয়া উৎসবে তেমন আড়ম্বর নাও দেখা যেতে পারে। বাঙালি এখন এই আশঙ্কায়।

* লেখক: ঋত্বিকা দাশগুপ্ত

Advertisement
-----