শাক দিয়ে আর মাছ ঢাকা গেল না

শ্লোগান ছিল ‘পরিবর্তন’। তাই টানা দু’বছর প্রতি মুহুর্তেই সেই শ্লোগান কার্যকর করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। আমরা, যারা এই রাজ্যের বাসিন্দা, তারাও প্রতি মুহুর্তে পুলকিত হচ্ছি এই রাজ্যে ‘পরিবর্তন’-র ঢালাও নিদর্শন দেখে। বেশ ভাল।

দেশ জুড়ে নতুন বার্তা দিল এই রাজ্যের ‘প্রো-অ্যাকটিভ‘ সরকার। জানিয়ে দিল মৃণাল সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তরুন মজুমদার সিনেমা-টিনেমা তেমন বোঝেন না। তাই ‘সংগত’ কারণেই ‘কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি’ থেকে এঁদের বিদায় করা হল। এই চারজনের জায়গাতে আনা হয়েছে পাঁচজনকে। এঁরা সবাই উৎসব কমিটির প্রধানের ঘনিষ্ঠ। সঠিকভাবেই আজ প্রশ্ন উঠেছে, বাংলার সিনেমায় এঁদের অবদান কী? যে চারজনকে ছেঁটে ফেলা হল, তাঁদের ধারে কাছেও কী এঁরা আসেন? এক বাক্যেই সবাই বলবেন, হতেই পারেনা। তাহলে ইচ্ছে না থাকলেও বলতেই হয়, বাংলার সিনেমা শিল্প সেই আগের মতই দলীয় রাজনীতির সাত পাকে বাঁধা রইল।

মুখ্যমন্ত্রী যতই বলুন যে, ‘‘আমরা-ওরাতে এই সরকার বিশ্বাস করেনা। উপযুক্ত লোকজনকে এই সরকার সম্মান দেয়। শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতিতে দলবাজি এই সরকার করে না”, আরও একবার বোঝা গেল সে সবই কথার কথা। মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন মহাকরণ যাঁর দখলে থাকবে, রাজ্যের সবকিছুই তাঁরা দখল করবে। সেক্ষেত্রে উপযুক্ত, যোগ্য লোকজনকে তাড়াতে হলে তাড়াব।

- Advertisement -

আশ্চর্য লাগে, বাংলার গর্ব যাঁরা, তাঁদের এইভাবে অপমানিত হতে দেখেও কেমন চুপ আছেন মুখ্যমন্ত্রীর অনুগৃহীত তথাকথিত ‘বিদ্বজন’ বাহিনী। বাম আমলে যে শুভাপ্রসন্ন, শাঁওলি মিত্র, অর্পিতা ঘোষ, বিভাস চক্রবর্তীরা পান থেকে চুন খসলেই বিবৃতি মারতেন, প্রেস কনফারেন্স করতেন, মিছিল-মিটিং করে বলতেন, ‘‘বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি রসাতলে গেল কমিউনিস্টদের হাতে”, তাঁরা আজ নীরব। মৃণাল, সৌমিত্র, তরুন, বুদ্ধদেবদের ঘাড় ধরে তাড়িয়ে সেখানে কাদের আনা হল, তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত একটা কথাও এই বাহিনী বলেননি। এই নীরবতার অর্থ আমরা জানি।

একদিকে যেমন এঁদের মেরুদন্ডর সবলতা নেই, অন্যদিকে প্রতিবাদ করে কে আর হারাতে চায় দুধ-মধুর জোয়ার। স্বার্থ আজ এঁদের এতটাই গ্রাস করেছে যে, দলদাস হতেও এই তথাকথিত ‘বিদ্বজন’দের আটকায়নি। ধিক এই ‘স্বজন’দের। ব্যতিক্রম একমাত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ। তিনি ইতিমধ্যেই বলেছেন, ‘‘এটা মোটেই ঠিক হয়নি। মৃণালদা, বুদ্ধদেবদা, তরুনদা প্রত্যেকেই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। নতুনরা নিশ্চই আসবেন। কিন্তু নতুনদের আনতে গিয়ে প্রথিতযশাদের সরানো সিদ্ধান্ত ভাল হয়নি।” গৌতম ঘোষ যা পারেন, শুভারা যে তা পারেন না, সেটা এবার প্রমাণ হল।

আসলে এখন এই রাজ্যে গুণীজনদের সম্মান জানানো মানে রবীন্দ্রসদন, টাউন হলে কিছু লোককে ডেকে, শাল-মিষ্টি-ফুল দেওয়া। এমনও অনেকে আছেন, যারা সরকারের পয়সাতে ইতিমধ্যে ২০/২৫টা শাল পেয়ে গিয়েছেন। বারবার এঁদের ‘‘সন্মান’’ জানানো হয়েছে। ব্যস ওই পর্যন্তই। সরকারের ‍আসল মুখ বেরিয়ে পড়ল মুখোশের আড়াল থেকে। মুখ্যমন্ত্রী বোঝালেন মৃণাল, সৌমিত্র, তরুন, বুদ্ধদেবের থেকে এই রাজ্যে বেশি গুণী মানুষ ব্রাত্য বসু, অরূপ বিশ্বাস, শিবাজী পাঁজা, শ্রীকান্ত মাহাতরা। সাবাস! এরপরও সরকারের তরফে বলা হবে, ‘‘আমরা দলতন্ত্রে বিশ্বাস করি না। আমাদের কাছে রাজনৈতিক রঙ নয়, গুণ-ই আসল।” এবং তারপরও আমরা হাততালি দিয়ে বাহবা জানাব এই সরকারকে। সত্যি, শাক দিয়ে আর মাছ ঢাকা যাচ্ছে কী?

আমরা নিশ্চিত, ২/১ দিনের মধ্যেই দেখব, অপযুক্তি দিয়ে কেউ কেউ এই কাজকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে মরিয়া চেষ্টা চালাবেন। কিছু মিডিয়া তেড়ে-ফুড়ে নেমে পড়বে এই কুকাজের সমর্থনে। সত্যি, কী দুর্ভাগ্য আমাদের যে একদিন আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম।
‘পরিবর্তন’ দীর্ঘজীবী হোক!!!

* লেখক: বশিষ্ঠ দাসশর্মা

Advertisement
---