‘সঙ্গীতের সঙ্গে আমার আত্মিক যোগ রয়েছে’: চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়

গায়ক ও সুরকার চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায় ৷৷

ছোট্টবেলায় অনেকেই প্রশ্ন করত ‘বড় হয়ে তুমি কি করবে?’ কিন্তু তখন ছোট্ট ছেলের মগজে নানান কল্পনা, দু’ চোখ ঘিরে নানান স্বপ্ন৷ সে তখন ব্যস্ত মা-বাবা-দিদির আদরে, খেলার ছলে ড্রাম বাজানোয়, দিদির সঙ্গে গানের কলিতে গলা মেলানোয়, স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায়, কেরিয়ার তৈরি করার চাপে পড়াশুনোয় মনযোগ৷ তবে শেষমেশ সে উত্তর অবশ্য পায়৷ তবে তা আসে হঠাৎ-ই৷ আইটি ইন্ডাস্ট্রি-র ব্যস্ত প্রোজেক্টে আটকে থাকা চিরন্তন, সব ছেড়ে হাঁটা দেয় স্বপ্ন পূরণে৷ সে এখন জানে সে কি হতে চায়৷ ‘হতে চায় প্লেব্যাক সিঙ্গার৷’ না, কোনও ধারাবাহিক বা সিনেমার গল্প নয়, বরং গল্প হলেও সত্যি, গায়ক-কম্পোজার চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্ন অভিযান৷ টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতায়, টুকরো টুকরো গল্পে তা একেবারে সুন্দর করে সাজানো, সেই গল্পই উঠে এল কলকাতা 24×7-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে৷ সাক্ষাৎকার নয়, বরং বলা ভাল, এক আড্ডায়৷ কাচের টেবিলে রাখা গরম চা, সামনে গায়ক চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়৷ পাশে চিরন্তনের মা, বাবা৷ কথা শুরু হল, সেই স্বপ্নের জন্ম থেকেই…

প্র: কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র, সিটিএসের মোটা টাকার চাকরী৷ হঠাৎ সব ছেড়ে দিয়ে গায়ক? কাকতালীয় নাকি পুরো প্ল্যানিং?

উ: (হেসে ফেলে) গায়ক হতে চাওয়ার গল্পটা অনেক গুলো এপিসোডে ভাগ করা৷ প্রথমটা একেবারে আমার ছোটবেলা৷ ছোটবেলায় কখনও ঠিকই ছিল না আমি গায়ক হব৷ তবে পরিবারের সবাই যেহেতু অল্প একটু সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত, তাই এক সঙ্গীতের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা৷ আমার দিদি ছোটবেলা থেকেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখত৷ আর তখন আমি ছোট্ট একটা টিনের ড্রাম বাজাতাম৷ তার পর আমি তবলা শিখতে শুরু করি৷ ‘মিউজিক সেন্স’ ছোটবেলা থেকেই ছিল৷ তালের জ্ঞান বলতে যা বোঝায়৷ তখন আমার বয়স ছয় বা সাত বছর হবে৷ এর পর মা-বাবা ঠিক করলেন দিদির সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও গানে শেখাবেন৷ সেই সময় গানের প্রতি কোনওরকম ডেডিকেশনই অনুভব করতাম না৷ এর পর আর একটু বড় হয়ে আমাকে অন্য একটা জায়গায় গান শিখতে পাঠানো হল৷ সেখানকার পরিবেশও আমার খুব একটা ভাল লাগল না৷ তবে গানটা আমি বাড়িতেই অনুশীলন করতে থাকি৷ ঠিক এই সময়ই একটা ঘটনা ঘটে, যেটাকে আমি বলতে পারি গায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখার শুরুওয়াত৷

540439_10150818984839590_409121836_n
রের্কডিংয়ে ব্যস্ত চিরন্তন ৷৷
- Advertisement -

আমি স্কুলে পারফর্ম করতে শুরু করি৷ আর সেই সময়ই ‘স্টেসম্যান’-এর উদ্যোগে এক গানের প্রতিযোগিতা ‘ভাইবস’-এ অংশগ্রহন করি৷ তার আগে পর্যন্ত গান গাওয়াটা আমার কাছে ছিল হবি বা বলা ভাল প্যাশন৷ সেই ‘ভাইবস’-এ প্রথম হই৷ আমার সঙ্গে আমার দুই বন্ধু যন্ত্রাংশে সাহায্য করেছিল৷ সেই ফার্স্ট হওয়ার অভিজ্ঞতা, নিউজ পেপারে আমাকে নিয়ে পাবলিসড হওয়া খবর দেখে আমার ভীষণ ভাল লাগে৷ প্রথমবার ফিল করি, আমার গাওয়া গান এত পছন্দ হয়েছে সবার৷ সেই সময় থেকেই অবচেতন মন ঠিক করে নেয়৷ গান নিয়ে কিছু একটা করতে হবে৷ তবে আমার লাইফে ইভেন্টের সবে শুরু আমি বলব৷ আরও ঘটনা রয়েছে যা আমাকে বিশ্বাস করিয়ে দেয় হ্যাঁ আমি পারব!

প্র: ইভেন্ট বলতে?

উ: বেশ কিছু বছর আগের কথা৷ একবার আমরা পাটনা থেকে একটা প্রোগাম করে ফিরছি৷ ট্রেনে আমাদের কেবিনের মধ্যে সবাই মিলে গান ধরেছি৷ ঠিক এমন সময়ই পাশের কেবিন থেকে একজন ভদ্রলোক এসে জানতে চাইল কে গান করছে? উত্তরে আমি হ্যাঁ বলতেই, আমাকে তাঁদের কেবিনে যেতে বলে৷ সেখানে আলাপ হল লেজেন্ড মিউজিক ডিরেক্টর ওপি নায়ারের ভাই সঙ্গীত কুমার নায়ারের সঙ্গে৷ আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না পুরো ঘটনাটা৷ উনি আমাকে উস্তাদ মোহনলাল মিশ্র-র ঠিকানা দেন৷ আর আমাকে বলে, তাঁর কাছ থেকে তালিম নিতে৷ কলকাতায় ফিরে আমি দেরি না করে যোগাযোগ করলাম উস্তাদ মোহনলালের সঙ্গে৷ সেটাও আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা৷ উস্তাদ প্রথমেই আমার গান শুনে আমাকে তাঁর শিষ্য বানানোর জন্য নারা বাঁধতে বলল৷ তালিমের শুরুতেই এই সুযোগ আসায় খুব ভাল লেগেছিল আমায়৷ আই ফিল ভেরি লাকি৷ সেই তালিম শুরু৷ আজ প্রায় আট, নয় বছর হয়ে গেল ওঁর কাছেই আমি তালিম নিচ্ছি৷ কেরিয়ারের শুরুতেই এই সব গুণীজনের সঙ্গ পেয়েছি৷ এর থেকে ভাল আর কি হতে পারে৷ তাই এই সব ঘটনা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট আমি মনে করি৷

প্র: সারেগামাপা-য়ের ফাইনালিস্ট ছিলেন৷ সেটাও তো বেশ বড় ইভেন্ট৷ রিয়্যালিটি শো-য়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

উ: ইয়েস৷ খুব বড় ইভেন্ট৷ অনেক কিছু শিখেছি৷ বলতে পারি টিকে থাকার অঙ্কটা এখান থেকেই শেখা৷ কোথায়, কীভাবে কথা বলেত হবে, কীভাবে গোটা ব্যাপারটিকে ডিল করতে হবে সব শেখা এই সারেগামাপা থেকেই৷ সহজ কথায় অনেকবেশি প্রফেশনাল করে তুলেছে এই সারেগামাপা৷ অনেক বেশি কমপ্যাক্ট, অনেকবেশি ম্যানেজড৷

প্র: এত গেল ব্যক্তিগত ক্ষেত্র৷ প্রফেশনালি কতটা হেল্প করেছে এই রিয়্যালিটি শো?

উ: অনেকটাই৷ দেখুন, স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই পারর্ফম করছি৷ জনপ্রিয় ছিলাম৷ তবে সারেগামাপা আমার জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে৷ বহু মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছি৷ যাঁরা আমার গান পছন্দ করেছে৷ একজন শিল্পীর এক থেকে বেশি আর কি-ই বা চাই৷

প্র: এই জনপ্রিয়তাকেই ক্যাশ করে নিজের সোলো অ্যালবাম৷ কলকাতায় বসে মার্কিন শহরে অ্যালবাম প্রকাশ৷ বিষয়টি একটু গুছিয়ে বলুন?

উ: ২০১০ সালে আমার একটা বাংলা গানের অ্যালবাম ‘মন ডুবুরি মন’ প্রকাশ করে, তার পর মার্কিনে মুক্তি পায় হিন্দি অ্যালবাম ‘শেডস অফ লাভ’৷আমরা তিন বন্ধু মিলে এক ব্যান্ড ফর্ম করি৷ যার নাম ‘ওহম লাইভ’৷ সেই ব্যান্ডেরই অ্যালবাম ‘শেড অফ লাভ’৷ এই  অ্যালবাম তৈরি হওয়ার পিছনে রয়েছে বিস্তর ঘটনা৷ পুরো অ্যালবামটাই কিন্তু রের্কডিং করা হয় অনলাইন৷ কলকাতা বসেই আমরা রের্কডিং, মিক্সিং সব কিছু করি ওয়েবের মাধ্যমে৷ ‘শেড অফ লাভ’-এর ইএসপিটা কিন্তু এটা হতেই পারে৷ শুধু তাই নয়, মার্কিন রেডিওতে এই অ্যালবাম এশিয়ার সেরাও হয়েছিল৷

প্র: আপনাদের তো একটা ব্যান্ডও আছে৷ ‘ভার্সেজাইল’৷ এরকম নাম কেন?

উ: হ্যাঁ, আমাদের ব্যান্ডের নাম ‘ভার্সেজাইল’৷ মানে ভার্সেটালিটি উইথ অ্যাজিলিটি৷ আসলে আমরা এরকম ধরণের গান করি, যার অঙ্কটা একেবারে অন্যরকম৷ এটাকে কিছুটা ক্ষেত্রে ফিউশনও বলা যেতে পারে৷ ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল সঙ্গীতের সঙ্গে আমরা মিলিয়ে দিই কনটেম্পোরারি গানকে৷ যেমন, কখনও কৈলাশ খেরে ‘তেরি দিওয়ানি’র সঙ্গে জেমসের ‘না জানে কোই’৷ আসলে ‘ভার্সেজাইল’-এর কাজ হল, দুটি ভিন্ন ধারার গানের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করা৷ আর এই লিঙ্কটা দেবে ওই দুটি গানই৷ আমরা যখন পারর্ফম করি৷৷ তখন বহুবার লক্ষ্য করেছি মানুষ প্রথমে অবাক হয়, তার পর পুরো ব্যাপারটা এনজয় করতে শুরু করে৷ এই এক্সপেরিমেন্টটা কিন্তু বেশ জনপ্রিয়৷

প্র: ফিউচার প্ল্যান কি? আর ঠিক পাঁচ বছর পর নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান?

উ: ব্যান্ড হিসেবে ভার্সেজাইলকে আরও অনেক দূর নিয়ে যাওয়া৷ আর আমার স্বপ্ন প্লেব্যাক গায়ক হওয়ার তার দিকে এগিয়ে যাওয়া৷ বেশ কিছু বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করেছি৷ সেগুলো মুক্তি পাবে নতুন বছরে যেমন, ‘আগুন’, ‘ক্যানভাস’, ‘দ্য এক্সপ্রেস’, ‘২৭ বিডন স্ট্রিট’৷ এছাড়াও মুম্বই থেকেও কিছু অফার এসেছে৷ সেগুলো অবশ্য প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে৷ আশা করি নতুন বছরটা ভালই যাবে৷ আর পাঁচ বছরটা খুব বড় টাইম৷ তার আগেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই৷ আশা করি তা করতে পারব৷ মিউজিক শুধু আমার প্রফেশন নয়, সঙ্গীতকে আমি ফিল করি৷

সাক্ষাৎকার : আকাশ মিশ্র ৷৷ ছবি: সিদ্ধার্থ সরকার ৷৷

157048_473397399589_6392978_n
চিরন্তনের প্রথম হিন্দি অ্যালবাম ৷৷
60276_436761494589_5843926_n
চিরন্তনের বাংলা অ্যালবাম ৷৷

 

 

 

 

Advertisement ---
---
-----