বিজ্ঞাপন দিয়ে বাঘ মারতে উৎসাহ দিতেন নেহরু

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: বাঘ মারতে শিখিয়েছে স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকারই। এমন হাজারও প্রমাণ মিলছে পঞ্চাশ, ষাটের দশকের কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া বিভিন্ন বিজ্ঞাপন থাকছে। শুধু জওহরলাল নেহরু নয়, কেন্দ্রে যখন বিজেপি সরকার তখনও বাঘ মৃত্যুর সংখ্যা কোনওভাবেই কমেনি।

১৯৫০ সাল। মাত্র তিন বছর হল ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে। ৫০এর ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান তৈরি হল। কেন্দ্রে তখন জওহরলাল নেহরুর সরকার। সেই সময়ের কেন্দ্র সরকারের বিজ্ঞাপনে ফলাও করে লেখা হয়েছে , “বাঘ শিকারের শিহরণ জাগানো দুঃসাহসিক অভিযানে যেতে চান? মিলবে ভারতের ঘনসবুজ জঙ্গলে। ছোটশিকারের পাশাপাশি মাছ ধরার দারুন অভিজ্ঞতাও পাবেন অভিযানে। আরও বিষদ তথ্যের জন্য আপনার ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে কিংবা ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’’

- Advertisement -

আরও পড়ুন: জেনে নিন কোথায় এ সপ্তাহে রবিবার ছাড়া তিনদিন ব্যাংক ছুটি

নিউইয়র্ক এবং সানফ্রানসিসকোতে ভারতের পর্যটন অফিস থেকে এই বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আরও একটি বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে, তাজমহলের মতো সুন্দর স্থাপত্য চাক্ষুষ দেখার পাশাপাশি যদি শিকার করতে চান তাহলে ভারতে আসুন। রাজা মহারাজরা বাঘ শিকার করতেন। অনেকে ঘরে বাঘ পুষতেন। এমন রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা মিলবে ভারতের ঘন সবুজ জঙ্গলে।

‘বাঘ মারো। মেরে আনন্দ কর’। এমন পাঠ খোদ ভারত সরকারের। আজ দিকে দিকে বাঘ বাঁচাও আন্দোলন। কেন্দ্র থেকে রাজ্য সরব বাঘ বাঁচানো নিয়ে। নানারকম প্রকল্পও হচ্ছে। কিন্তু ‘গলদ গোড়াতেই’। স্বাধীনতা পরবর্তী যুগ থেকে বছরের পর বছর সেই ট্রেন্ডই যেন থেকে গিয়েছিল। ফল, ১ লক্ষ থেকে বাঘের সংখ্যা কমে ২,২২৬ (২০১৬ বাঘ সুমারি) এসে ঠেকেছে।

আরও পড়ুন: ভোটের আগে ভুয়ো খবর নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ হোয়াটসঅ্যাপের

অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েও বাঘ মারা হয়েছে দেদার৷ অন্তত পরিসংখ্যান তাই বলছে৷ ১৯৯৯-২০০৩ সালের মধ্যে ৪১১টি বাঘ স্রেফ উধাও হয়ে গিয়েছে। কোনও খোঁজ মেলেনি।

ভারত সরকারের তথ্যই বলছে, ওই ৪১১টি বাঘের মধ্যে ১১৪টি বাঘের নিখোঁজের সঙ্গে সরাসরি চোরা পাচারের যোগ ছিল। ২৩৮টি বাঘের ছাল এবং হারের অবশিষ্টাংশ মেলে ভারতের বিভিন্ন জঙ্গল এবং বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকে। এগুলির সঙ্গেও চোরা পাচারের যোগই আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: তৃণমূলের ঘর ‘ভাঙল’ বিজেপি

বাকি ৫৯টি বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এক জনৈক প্রাণী বিশারদ সুপ্রিম কোর্টে বাঘ মৃত্যু নিয়ে মামলা দায়ের করেন। সরকারের পক্ষে তখন আদালতে এই হিসাবটিই পেশ করা হয়েছিল। অথচ ১৯৭০ সালে কিন্তু ভারতীয় বন্য আইন লাগু হয়ে গিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা দেবপ্রসাদ রায় বলেন, “এটা নিয়ে লুকানোর কোনও জায়গা নেই যে আমরা সেই সময়ে প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে আমরা একেবারেই সচেতন ছিলাম না। অনেক দিন পর্যন্ত আমরা অবচেতন ভাবে এই কাজ করে গিয়েছি। ১৯৫০ সালে কেন্দ্রে আমাদের সরকারের সময়েই যদি ওই বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় তাহলে সেটা মারাত্মক ভুল হয়েছিল।”

আরও পড়ুন: টেক্সাসের আকাশে তীব্র নীল আলো দেখল শয় শয় মানুষ

একইসঙ্গে তিনি বলেন, “তৎকালীন রাজা মহারাজারা বাঘ শিকারকে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্ট হিসাবে নিত। কোচবিহারের রাজা একাই দেড়শো বাঘ মেরেছিলেন বলে শোনা যায়। এটা তৎকালীন গর্বের বিষয় ছিল। এই কাজ করলে তিনি বাহবা পেতেন। যে এমন কাজ করত তিনি বীর বলে পরিগণিত হতেন।”

আরও পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে ১৯২০ সালে একটি শিকার যজ্ঞে পরপর পাঁচটি বাঘ এবং একটি গণ্ডারকে মেরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন শিকারে অংশগ্রহণকারী দল। ১৯২৬ সালে আলোয়ারের মহারাজা তাঁর ফিরিঙ্গি বন্ধুদের জন্য এক বিশাল বাঘ শিকারের আয়োজন করেছিলেন। এই শিকারে অংশ নিয়েছিল প্রায় ৩০০ জন মানুষ এবং ১২টি হাতি। তৎকালীন বাংলার অন্তর্গত ভাওয়াল রাজার এক পোট্রেটে মৃত বাঘের উপর পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি মিলেছে।

আরও পড়ুন: বড়সড় সাফল্য! ১৫ আইএস জঙ্গিকে খতম করল নিরাপত্তা বাহিনী

কেন্দ্র নড়েচড়ে বসেছে ২০০৪ সাল থেকে। তখন কেন্দ্রে আবারও সেই কংগ্রেস সরকার। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। ২০০৬-এর বাঘ সুমারির তথ্য অনুযায়ী, সেই সময়ে বাঘের সংখ্যা ছিল ১৪১১টি। ২০১০ তখনও কেন্দ্রে কংগ্রেস। ওই বছর বাঘ সুমারিতে বাঘের সংখ্যা বেড়ে হয় ১৭০৬।

২০১৬-র বাঘ সুমারিতে বাঘের সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২,২২৬টি বাঘ রয়েছে ভারতে। তখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসে গিয়েছে আবারও বিজেপি সরকার। যদিও বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির মাঝেও মহারাষ্ট্রে অবনী, মেদিনীপুরের লালগড়ে বাঘ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়ুন: সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নতুন এক যুদ্ধাস্ত্রের সফল পরীক্ষা করলেন কিম

এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যবনপাল রবিকান্ত সিনহা বলেন, “ওই সময় সত্যিই কোনওরকম জ্ঞান ছিল না। তার জন্য একসময় যে বাঘের সংখ্যা ভারতে এক লক্ষ ছিল সেটা কমে গিয়ে দেড় হাজারে পৌঁছে গিয়েছিল। এখন ভালো কাজ হচ্ছে। বাঘের সংখ্যা বাড়ছে। তবে একটি বাঘ মানুষ মারলে তার জন্য আরও দুটি বাঘকেও যদি মারা হয় তাহলে সেটা মারাত্মক অপরাধ। মানুষের আরও সচেতনতার দরকার রয়েছে।”

আরও পড়ুন: নজর বেসরকারি স্কুলে, রাশ টানতে কড়া বিল আনছে রাজ্য : পার্থ