পাক নির্বাচন: সেবার মুজিব জিততেই কলকাতায় পড়েছিল শোরগোল

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: সময় পেরিয়ে গেলেও মুহূর্তগুলো স্মৃতিতে থেকে গিয়েছে অনেকের৷ রাজনৈতিক টালমাটালে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ সবকিছু ভুলে তখন আকাশবাণীর সংবাদে মত্ত ছিলেন৷ কে জিতছেন পাকিস্তানে ? মুজিব না ভুট্টো কার হাতে যাচ্ছে পাকভূমি ? মহানগর কলকাতা ছাড়িয়ে এই প্রশ্নই ঘুরছিল সর্বত্র৷ পূর্বের বাংলাতে তো কথাই নেই, ঢাকার রাস্তায় নেমেছিল জনস্রোত৷

পাকিস্তানের ইতিহাসে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন সর্বাপেক্ষা ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেয়ে আসছে এবং থাকবেও৷ সরাসরি বাঙালি বনাম উর্দুভাষী মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে দ্বিদলীয় রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছিল সেবারের ভোটযুদ্ধ৷ আর দুই পক্ষের সেনাপতি ছিলেন মুজিবুর রহমান ও জুলফিকর আলি ভুট্টো৷ ১৯৭০ সালের সেই নির্বাচনের পরেই দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল পাকভূমি৷ রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ শেষে তৈরি হয় বাংলাদেশ৷

পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মুজিব নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বনাম জুলফিকর আলির পাকিস্তান পিপলস পার্টির লড়াইয়ের খবর রাখছিলেন পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা৷ ঘরের কাছে পূর্ব পাকিস্তান মানেই বিশাল বাংলা৷ পদ্মা-করতোয়া-ধানসিড়ির জলে বিধৌত আবেগের ভূখণ্ড এবং ফেলে আসা মাটির টান৷ ফলে সেখানকার রাজনৈতিক উত্তাপে গরম হয় এপার৷ আবার রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও ঘাতপ্রতিঘাতে রক্তাক্ত হচ্ছিল পশ্চিমবাংলা৷ নকশাল আন্দোলন, বামপন্থী বনাম ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের লড়াই ঘিরে উত্তপ্ত বাতাবরণেও আকাশবাণী সংবাদ ও প্রভাতী দৈনিকে পূর্ব পাকিস্তানের খবর দাগ কেটে যায় মনে৷

- Advertisement -

পাকিস্তানে তখন সামরিক শাসন চলছে৷ ইয়াহিয়া খান কুর্সিতে৷ এমন অবস্থায় নির্বাচন ঘোষণা করে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে মরিয়া ছিলেন ইয়াহিয়া৷ সেবারের নির্বাচনে ৩০০টি আসনে মোট ২৪ টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে৷ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৭০ আসনে প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে ১৬২টি ছিল আসন পূর্ব পাকিস্তানে এবং অবশিষ্ট ৮টি আসন পশ্চিম পাকিস্তানে। জুলফিকর আলির ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি ১২০ আসনে প্রার্থী দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে তারা কোন প্রার্থী দেয়নি। প্রার্থী দেওয়ার নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে ছিল জামাত ইসলামি৷ তাদের হয়ে ভোটে লড়েছিলেন ১৫১ জন৷ অন্যান্য দলগুলি যেমন পিএমএল (কনভেনশন) ১২৪ আসনে, পিএমএল (কাউন্সিল) ১১৯ আসনে এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগ (কাইয়ুম) ১৩৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

নির্বাচনী ফলাফল বের হতেই দেখা যায় মুজিবুর রহমানের বিজয় রথ আটকানোর ক্ষমতা কারোর নেই৷ পূর্ব পাকিস্তান থেকে তিনিই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসতে চলেছেন৷ তাঁর সঙ্গে লড়াইয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছিলেন ভুট্টো৷ পাক ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলিতে (জাতীয় আইনসভার ভোট) আওয়ামী লীগ ১৬০ টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাধারণ নির্বাচনে একই সাথে প্রাদেশিক আইনসভার ভোট হয়েছিল৷ সেখানেও পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবুর রহমানের জয়যাত্রা অব্যাহত৷ আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। আর পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের ৮১টিতে জয়ী হয়৷

মুজিবের ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার খবরে উত্তেজনায় ফুটছিলেন পশ্চিমবঙ্গবাসী৷ পূর্ব বাংলার মানুষের মতো উৎসাহে মুজিবুর রহমানের এগিয়ে যাওয়ার খবর উপভোগ করছিলেন৷ শুরু হয় রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা৷ এদিকে চূড়ান্ত ফল বের হতেই ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় লাখো মানুষ নেমে পড়েন৷ সেই খবর কলকাতায় আসতেই রাজনৈতিক মহল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আলোড়ন৷ পাকিস্তানের ক্ষমতায় মুজিবুর রহমান ? যিনি একসময় কলকাতাতেই তাঁর ছাত্রাবস্থা কাটিয়ে গিয়েছেন৷ যিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতায় ডুবে থাকেন তিনিই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসছেন৷ আওয়ামী লীগের জয় সংবাদে তখন ঢাকা-কলকাতা একাকার৷

অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের পরিস্থিতি অন্যরকম৷ আওয়ামী লীগের সরকার গঠন নিয়ে শুরু হয়েছিল তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর৷ সেখানকার জনপ্রিয় নেতা জুলফিকর আলি ভুট্টো এই পরাজয় মেনে নিতে না পেরে শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকার গড়া থেকে দূরে রাখার পরিকল্পনা করছিলেন৷ কারণ মুজিব চাইছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন৷ এটা মেনে নিলে উর্দুভাষীদের হাত থেকে বেরিয়ে যাবে বিশাল এলাকা৷ এই অবস্থায় ভুট্টো আইনসভা বয়কট করার হুমকি দেন৷ তিনি জানান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি মুজিবুর রহমানকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান করেন তাহলে সরকার মেনে নেওয়া হবে না৷ পরিস্থিতি ঘুরে যায়৷ ইয়াহিয়া খানের গড়িমসিতে পূর্ব পাকিস্তানি তথা বাঙালিরা বুঝতে পারেন সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করা হবে না৷

সময় যত পার হচ্ছিল ততই বাড়ছিল উত্তেজনা৷ লাখো জনতার দাবি মেনে নিয়েই চরমতম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুজিবুর রহমান৷ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভা থেকে স্বাধীনতার ডাক দেন৷ ব্যস শুরু হয়ে গেল পাকিস্তান বিরোধী মুক্তিযুদ্ধ৷ পরবর্তী অধ্যায় চরম রক্তক্ষরণের৷ একাত্তরের সেই সংঘর্ষে ভারত সরকার সর্বতোভাবে সাহায্য করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ও মুজিবুর রহমানকে৷ পাক সেনার নির্বিচারে খুন শুরু করেছিল৷ কোনওরকমে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলেন কলকাতা সংলগ্ন এলাকা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায়৷

সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েও ক্ষমতায় বসতে পারেননি মুজিবুর রহমান৷ কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের কর্ণধার হয়েছিলেন৷

Advertisement ---
---
-----