আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবসের অতিথিরা৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: পুরানো নানা ধ্যান-ধারণা থেকে তাঁরা এখনও সেভাবে মুক্ত হতে পারেননি৷ কাজেই, দুনিয়া বদলে এবং এগিয়ে চললেও, এখনও নিজেদের সেভাবে বদলাতেও পারেননি তাঁরা৷ অথচ, তাঁরাই আবার প্রদান করছেন যৌনসুখের পরিষেবা৷ কিন্তু, তাঁরা এখনও ব্যবহার করেন না স্যানিটারি ন্যাপকিন৷

তাঁদের মতো অন্য অনেকেও একসময় ব্যবহার করতেন না স্যানিটারি ন্যাপকিন৷ তবে, রজঃস্রাবের সময় কেন এবং কীভাবে স্বাস্থ্যসুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, সে সব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য রয়েছে নানা রকমের উপায়৷ আর, ওই সব উপায়ের জেরে এখন অবশ্য ওই অন্য অনেকে ব্যবহার করছেন স্যানিটারি ন্যাপকিন৷ কিন্তু, স্যানিটারি ন্যাপকিন এখনও ব্যবহার করেন না তাঁরা৷ তাঁদের সংখ্যা অর্থাৎ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করার ওই হার এখন ২১ শতাংশ৷

বছর দু’য়েক আগেও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করার ওই হার ছিল ৪০ শতাংশ৷ কিন্তু, রজঃস্রাবের সময় স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টির উপর বিশেষ নজর দেওয়াটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের হারও৷ যে কারণেই এখন যৌনকর্মীদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে স্যানিটারি ন্যাপকিন৷ এই ধরনের পরিস্থিতি কলকাতার৷ এ রাজ্যের যৌনকর্মীদের অন্যতম সংগঠন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির মুখ্য উপদেষ্টা ডাঃ স্মরজিৎ জানার কথায়, ‘‘যৌনকর্মীদের সকলেই যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন, আমাদের এখানে সেই প্রচেষ্টাই জারি রয়েছে৷ তবে, এখনও এখানকার যৌনকর্মীদের ২১ শতাংশ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না৷’’

যৌনকর্মীদের মধ্যে একশো শতাংশ ক্ষেত্রেই যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার হয়, সেজন্য বছরের বিভিন্ন সময় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থাও রয়েছে৷ আর, তার সঙ্গে রয়েছে ২৮ মে-র আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবসও৷ দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি-র সচিব ভারতী দে বলেন, ‘‘আগের তুলনায় এখন স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার অনেক বেড়ে গিয়েছে৷ যাঁরা ব্যবহার করেন না, তাঁরা এখনও পুরানো পদ্ধতিতেই আটকে রয়েছেন৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘যৌনকর্মীদের মধ্যে বয়স যাঁদের বেশি, সাধারণত তাঁদের ক্ষেত্রেই স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে৷’’

দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির সচিবের কথায়, ‘‘যৌনকর্মীদের সকলেই যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন, তার জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা রয়েছে৷ ওই ব্যবস্থার অঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন সময় ফ্রি-তেও স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া হয়৷’’ কীভাবে? ভারতী দে বলেন, ‘‘যখন কোনও কোম্পানি স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারে আনে, তার আগে আমাদের এখানে বহু সংখ্যক স্যাম্পেল দেওয়া হয়৷ ওই সব স্যাম্পেল-ই যৌনকর্মীদের ফ্রি-তে দেওয়া হয়৷ তার জন্য একদিকে যেমন স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহারের বিষয়ে যৌনকর্মীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা সম্ভব হয়, অন্যদিকে ওই স্যানিটারি ন্যাপকিনের মান কেমন, সেই বিষয়েও ফিডব্যাক পেয়ে যায় ওই সংস্থা৷’’

স্যানিটারি ন্যাপকিন ফের ফ্রি-তে দেওয়া হল বৃহস্পতিবার, আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবসের অনুষ্ঠানে৷ দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি এবং ওই সংগঠনেরই অধীনে থাকা আমরা পদাতিকের আয়োজনে বৃহস্পতিবার বউবাজারের প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটে পালিত হয় আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবস৷ শুধুমাত্র সেখানকার যৌনকর্মীরা নন৷ ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য অনেকেও নিয়েছেন ফ্রি-র ওই স্যানিটারি ন্যাপকিন৷ রজঃস্রাবের বিষয়ে প্রচারপত্রও বিলি করা হয়েছে ওই অনুষ্ঠানে৷ পুরানো নানা ধ্যান-ধারণা এবং কুসংস্কার-ভ্রান্ত ধারণার অবসানের মাধ্যমে কীভাবে রজঃস্রাবের সময় সংক্রমণমুক্ত থাকা সম্ভব, সেই বিষয়টিও রাখা হয়েছে ওই প্রচারপত্রে৷ রজঃস্রাবের সময় যাতে উপেক্ষিত না হয় স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টি, তার জন্য লজ্জা-নীরবতা ভেঙে মহিলা-পুরুষ উভয়কেই এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে ওই অনুষ্ঠানে৷ আর, যে কারণেই ওই অনুষ্ঠানের স্লোগান রাখা হয়, ‘মাসিক নিয়ে লজ্জা নাই / ভয় ভাঙাতে আমরা সবাই’৷

বৃহস্পতিবারের ওই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন ভারত সরকারের ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বোর্ড (পূর্বাঞ্চলীয়) ডেমনস্ট্রেশন অফিসার মিতালি পালোধি৷ রজঃস্রাবের সময় কীভাবে সংক্রমণমুক্ত থাকা সম্ভব, ওই সময়ে সুস্থ থাকার জন্য কেন-ই-বা প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবারের, এমন নানা বিষয়ে তিনি মত ব্যক্ত করেন৷ রজঃস্রাবের সময় লৌহযুক্ত খাবারের উপরও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন৷ দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির ডাঃ প্রতিম রায় বলেন, ‘‘রজঃস্রাবের সময় স্বাস্থ্যসুরক্ষায় স্যানিটারি ন্যাপকিন অধিক সুরক্ষিত ব্যবস্থা৷ ওই সময় সুরক্ষিত না থাকলে, স্বাস্থ্যের উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে রজঃস্রাব৷’’

দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবসের অনুষ্ঠান, এই নিয়ে তৃতীয় বার৷ বৃহস্পতিবারের ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেন ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়ার কয়েকজন গবেষক-শিক্ষার্থীও৷ তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্রিস্টিন স্মিথ৷ রজঃস্রাবকে যাতে সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়, তার উপর জোর দেন তিনি৷ ২৮ মে বিশ্বজুড়ে ১৪৮টি সংগঠন আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবস পালন করেছে বলেও জানানো হয় কলকাতার ওই অনুষ্ঠানে৷ ওই ১৪৮টির মধ্যে রয়েছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি এবং আমরা পদাতিকের ওই অনুষ্ঠানও৷

=======================================================

----
--