এত কষ্টেও নিজের প্রতিভাকে হারাতে দেননি এই কবিতার ফেরিওয়ালার

তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: সংসারের হাল টানতে টানতে কাটিয়ে ফেলেছেন জীবনের অনেকটা সময়। জীবিকার তাগিদে যেমন অন্যের চাষের জমিতে দিনমজুরের কাজ করেছেন। তেমনি কখনও কামারশালে হাতুড়ি পেটানোর কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। আবার একশো দিনের কাজ প্রকল্পে মাটি কাটার কাজও করছেন তিনি। কিন্তু এত সবের পরেও নিত্য অভাবকে সঙ্গী করেও নিজের সহজাত কাব্য প্রতিভাকে বিকশিত করে চলেছেন প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই সুধীর কর্মকার।

বাঁকুড়ার সোনামুখীর ধানসিমলা গ্রামের কর্মকার পাড়ার এই বাসিন্দা মনের আনন্দেই লিখে চলেছেন একের পর কবিতা। পাড়ার মানুষের সহযোগিতায় ইতিমধ্যেই তার দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। তার অন্যতম জনপ্রিয় কবিতার বই ‘বাঁশের বাঁশি’। ২০১১ সালে জয়পুরে তিনি ‘কবি সম্মান’ পেয়েছেন। ২০১৪ সালে ‘অভিব্যক্তি সম্মানে’ ভূষিত হন সুধীরবাবু।

বহু বিখ্যাত ও গুনী মানুষ তার কবিতা পড়ে অভিভূত হয়েছেন। তাকে ব্যতিক্রমী কবি আখ্যা দিয়েছেন কেউ কেউ। সত্যিই তিনি ব্যতিক্রমী। দিনমজুর খাটতে খাটতেই কবিতা লিখে চলেছেন এই স্বভাব কবি। যেকোন ধরণের কাজ করতে করতেই আপন খেয়ালে বলে যেতে পারেন নিজের লেখা কবিতা। অমৃতধারা, ঐকতান প্রভৃতি প্রথম সারীর সাহিত্য পত্রিকায় তার লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ও আগামী দিনেও হবে।

- Advertisement -

নিত্য অন্ন চিন্তাকে সঙ্গী করেই তিনি এই বয়সে এখনও ঘুরে বেড়ান জেলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত নানা সাহিত্য সভায়। বয়সের ভারে তাঁর ভারী কাজ করতে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু দিন মজুর না খাটলে পেট চলবে কি করে? তাই তাকিয়ে আছেন সরকারি সাহায্যের দিকে। কিন্তু খামতি নেই কাব্য চর্চায়। কবিতা তাকে জাগিয়ে রাখে মধ্যরাতেও। পাড়ার মানুষের তাঁকে নিয়ে গর্বের অন্ত নেই। তাদের মাঝে এমন একজন ব্যতিক্রমী কবি আছেন বলে তাঁরা গর্ববোধ করেন।

কিন্তু যে মানুষটিকে নিয়ে এত কথা সেই ব্যতিক্রমী প্রতিভা সুধীর কর্মকার যেন প্রতিনিয়ত কাব্যচর্চাতে নিজেকে নিমগ্ন রাখতে ভালোবাসেন। পথ চলতে চলতে, একশো দিনের প্রকল্পে মাটির কাজ করতে করতে, গোরুর জন্য বিচুলি কাটার মধ্যেও আপন খেয়ালে কবিতায় ডুবে থাকা মানুষটির কাছে যেন জীবন মানেই কবিতা।

কিন্তু তার একটাই আক্ষেপ, এই বয়সে এসেও দু’মুঠো খাবারের জন্য ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে যেতে হয় একশো দিনের কাজে। সরকারি উদ্যোগে নেই কোনও ভাতার ব্যবস্থা। বৃদ্ধ ভাতার জন্য অনেকের কাছে দরবার করেও কোন কাজ হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন অনেক কিছুই মনে রাখতে পারেন না। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশীদের প্রতি কৃতজ্ঞ এই মানুষটি কাব্য চর্চায় তাদের উৎসাহের কথা জানাতে ভোলেন না। তাদেরই সম্মিলীত উদ্যোগে তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শেষ দিশা’ প্রকাশের পথে সেকথাও গর্বের সঙ্গে জানালেন কবি সুধীর কর্মকার।

Advertisement
---