নতুন করে সরোজ দত্তকে খোঁজার চেষ্টা

গৌতমী সেনগুপ্ত-  আমরা ভুলে যাই ইতিহাস, যা ভোলাতে বাধ্য করে রাষ্ট্র৷ মিথ্যেকেই সত্যি ভাবি প্রশাসনের দাপটে৷ সময়ের প্রলেপে সেই মিথ্যেটাই চিরন্তন সত্যি হয়ে দাঁড়ায়৷ তবে, কোথাও কি ফাঁক থাকে? হয়ত থাকে, তাই হয়ত কবি, সাংবাদিক সরোজ দত্তের ‘নিখোঁজ’আজও মেনে নিতে পারেন না সমাজের এক বড় অংশ৷ কেউ অন্তর্ধান,কেউ নিখোঁজ হয়ে ইতিহাসকে সেই জায়গায় থামিয়ে রাখে, যেমন রেখেছিলেন সরোজ দত্ত৷ ১৯৭১ সালে সরোজ দত্ত ‘নিখোঁজ’হওয়ার পর গণমোহিনী লেখা থমকে যায়৷ একটা অশনি সংকেত তির হয়ে এসে ফালা হয়ে বেরিয়ে যায়৷

কেন ‘নিখোঁজ’সরোজ দত্ত? ৭১-এর ৪ বা ৫ অগাস্ট রাতে পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে গেল৷ তারপর!!!! সেই তারপরের খোঁজেই তথ্যচিত্র ‘SD’৷ পরিচালক কস্তুরী বাসু ও মিতালী বিশ্বাসের সাহসী পদক্ষেপ বলা যেতেই পারে৷ টানা ২ ঘণ্টা সরোজ দত্ত ও নকশাল আন্দোলনের একটা যাত্রা৷ ঠান্ডা মাথায় সরোজ দত্তকে খুন?? রাখাঢাক?? ধামাচাপা দিয়ে পড়ে থাকা বন্ধ ফাইলটা যেন সেলুলয়েডে খুলতে চেয়েছিলেন কস্তুরী ও মিতালী৷

- Advertisement -

হ্যা, সরোজ দত্ত তরুণ প্রজন্মেরই৷ আঠারোর জন্যই তো সরোজ৷ তথ্যচিত্রে সেই বার্তাই স্পষ্ট৷ এমনটাই তো শোনা যায় – পুলিশের গাড়িতে করে সরোজ দত্তকে ভোর রাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফাঁকা ময়দানের দিকে৷ যথারীতি এক সময় গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে তাঁকে বলা হয়েছিল- আপনি মুক্ত, বাড়ি চলে যেতে পারেন। তখন ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য হাঁটা দিতেই পিছন থেকে তখন নাকি গুলি করা হয়েছিল৷ যদিও দেহ সরিয়ে সরোজ দত্ত ‘নিখোঁজ’বলে পুলিশের তরফে জানান হয়েছিল৷ তথ্যচিত্রে দুই পরিচালিকা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটেই সরোজের মৃত্যুর শব্দ শোনায়৷ ভেসে ওঠে সরোজের কবিতা-

‘আমার কবিতা কভু কহিবে না আমার কাহিনী,
‘দুঃসাহসী বিন্দু আমি , বুকে বহি সিন্ধুর চেতনা’

৪৭-এর তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী বেলা দত্তের স্বামী সরোজ,তখন অমৃতবাজার পত্রিকার সাংবাদিক৷ তথ্যচিত্র এগোচ্ছে, তেভাগা আন্দোলনের সেদিনের নেত্রী বেলা আজ বয়স ভারে জর্জরিত৷ সরোজ দত্তের ছেলে কুনাল দত্ত মাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন সেই ভীষণ বিদ্রোহের কথা৷ সব মনে রেখেই অস্পষ্ট বাংলায় বৃদ্ধা বললেন, ‘সব গয়না দিয়েছিলাম’বলেই শিশুর মতই হেসে উঠলেন৷ বোমা তৈরি করতেন কীভাবে তাও বললেন৷ তথ্যচিত্র ক্রমশই জীবন্ত হয়ে উঠল৷ জীবন্ত হয়ে উঠলেন ‘SD’৷

তেভাগা আন্দোলনের আকস্মিক থেমে যাওয়া বুঝিয়ে দিল সিপিএম ভাঙছে৷ সব পর্বই চলল সরোজের সঙ্গেই, চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নকশালবাড়ি আন্দোলন, কানু সান্যালের সশস্ত্র বাহিনী, ৬০ হাজারের উপরে খালি পেট চাষাদের আন্দোলনের হুঙ্কার৷ সরোজের দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা লেখনী৷ সব মিলিয়েই তথ্যচিত্র তুলে ধরে বাংলার ধামাচাপা পড়া প্রচণ্ড ইতিহাসকে ৷ কেন্দ্রবিন্দু সরোজ দত্ত৷

একে একে গ্রেফতার হচ্ছেন নকশাল নেতারা৷ সরোজও হোলেন৷ ছাড়া পেলেন ১৪ মাস বাদে৷ জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ‘শশাঙ্ক’নাম নিয়ে লেখা শুরু তাঁর৷ আরও বিপ্লবের সেই লেখা চিরদিনের, চিরকালের৷ বিপ্লব যেখানে সেখানেই সরোজ দত্তের লেখা৷ এটাই হয়ত অজানা আজকের প্রজন্মের কাছে৷ সরোজ দত্ত শুধুই‘নকশাল’ কবি নন৷ সরোজ দত্ত তারুণ্যে ফুলকি৷ তিনি লিখেছেন শুধু, লিখেই গেছেন৷ ‘রত্নাকর’, ‘বঙ্গরঙ্গ’, ‘সংশয়’, ‘কোনও বিপ্লবী কবির মর্মকথা’, ‘মধ্যবিত্তের বিপ্লব বিলাসের ’মত কবিতা থেকে একগাদা লিখিত দস্তাবেজ, যার বর্তমান সংগ্রহশালা সরোজ দত্তের ছেলে কুনাল দত্তের বাড়ি৷ যে বাড়িতে সরোজ দত্ত প্রতি কোণায়, বেলা দত্তের অস্পষ্ট বাংলায়৷ তথ্যচিত্রের শেষে বাঁধ ভাঙা কান্না চেপে ছিলেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী ৷ তাঁদের বাড়িতেই গা ঢাকা দিয়েছিলেন সরোজ দত্ত৷ ৭১-এর ৪ অগাস্ট গভীর রাত, পুলিশ তুলে নিয়ে যায় সরোজ দত্তকে৷ তারপর–

‘শুধু জেনো একদিন গুদামের গর্ভ অন্ধকারে
‘আদমসুমারী মোর শেষ হবে বেদম প্রহারে’

তদন্ত ধামাচাপা, ফাইল বন্ধ৷ সরোজ দত্ত আজও নিখোঁজ৷ রক্তাক্ত দেহের মেলেনি হদিস৷ কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর গোপন বয়ান বলছে, দেহ লোপাটের আগে কাটা হয়েছিল সরোজ দত্তের মাথা৷ তথ্যচিত্র সমাপ্ত হচ্ছে সেই গাছটার শুকনো পাতায়৷ যে গাছ ধরেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন সরোজ৷

কস্তুরী বসু এবং মিতালী বিশ্বাস। কলকাতা

এই ১১৫ মিনিটের ‘SD: Saroj Dutta and his Times’তথ্যচিত্রে কেমন যেন অসম্পূর্ণ থেকে গেল৷ কারণ ছবিতে উঠে আসেনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় এবং বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তমকুমারের প্রসঙ্গ ৷ প্রশ্ন থেকে গেল- সেই সময় নকশাল দমনের নামে মানুবাবুর ভূমিকা কেমন ছিল তা কেন এই ছবিতে তুলে ধরা হল না ? আর এটাই তো কথিত ময়দানে সরোজ দত্তের হত্যাকাণ্ড যখন হয়েছিল যখন তখন সেখানে প্রাত: ভ্রমণে করতে এসেছিলেন মহানায়ক৷

শুধু তাই নয় ওই হত্যাকান্ডের জন্য সরকারের পক্ষে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ার চাপ ছিল তাতে প্রথমে কিন্তু উত্তমকুমার একেবারেই রাজি ছিলেন না৷ বরং বার্তা দিয়েছিলেন আদালতে ডাকলে তিনি যা দেখেছেন সেটাই বলবেন৷ ঠিক ওই সময় মানুবাবুর নির্দেশে ছাত্র পরিষদের এক নেতা তাকে টেলিফোনে শাসায়৷ প্রচন্ড ভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে সেইসব কথা উত্তমকুমার অভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়েছিলেন বলেই জানা যায় এবং তারপরে একেবারে প্রাণভয়ে বম্বে চলে যান। দু’মাস পরে ফিরে এসে জানিয়েছিলেন – তিনি কিছুই দেখেননি।

Advertisement ---
---
-----