মুক্তবিহঙ্গ হয়ে বাঁচবে ওরাও

ফাইল ছবি

‌পার্থসারথি গুহ:বেশ কয়েকবছর আগে সোশ্যাল মাধ্যমে আলাপ হয়েছিল এমন একজনের সঙ্গে যাকে নামে নারী মনে হলেও সে পুরুষ সত্ত্বা নিয়ে বাঁচতে চায়। অথচ সমাজ, তার আত্মীয়স্বজন, বাড়ির লোক একে অপরাধ মনে করে। তাঁর এই শারীরিক গঠন বা চাহিদা তো মোটেই অপরাধের নয়। সে নিজের মতো করে কোনও নারীর সঙ্গে বাঁচতে চাইতেই পারে।

বিপরীতে থাকা সেই নারী যদি তার মধ্যে নির্ভরতা খুঁজে পায় তাহলে তো দোষের কিছু নেই। অথচ বাধা হয়ে দাঁড়াল আইনের ৩৭৭ ধারা। যে আইন দুজন সমলিঙ্গের মানুষের মেলামেশাকে অপরাধ বলে মনে করত। এমন কি এই ধরনের সম্পর্ক অবাধ মেলামেশায় পর্যবসিত হলে তাতে ১০ বছরের কারাবাস পর্যন্ত লাগু করা যেত। সেই শৃংখল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল সমাজ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মধ্যে দিয়ে।

হ্যাঁ, এখন ৩৭৭ ধারার নামে আর ওদের মেলামেশা, সম্পর্ক স্থাপনে বাধা দেওয়া যাবে না। মহাকাব্যে যাদের উল্লেখ ছিল আজ তাদের জীবনে নতুন করে শিখণ্ডি হয়ে উঠতে পারবে না কোনও আইনের বেড়াজাল। সমাজও একদিন সার্বিকভাবে মেনে নেবে এই অন্যধারার মানুষদের, সম্মান জানাবে তাদের সম্পর্ককে।

‌আজ বেশ কিছু এমন মানুষের ছবি সামনে উঠে আসছে যারা দীর্ঘদিনের কুণ্ঠা কাটিয়ে হয়তো সমাজের মূলস্রোতে মিশে যেতে পারবেন আর পাঁচজনের মতো। মুক্ত বিহঙ্গের মতো তার বা তাদের স্বতঃস্ফূর্ততাকে মেলে ধরতে পারবেন এই সমাজের বুকে। এত তাড়াতাড়ি হয়তো সবকিছু পালটে যাবে না।

তবে যে আন্দোলন ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে, যার স্বীকৃতি মিলেছে স্বয়ং শীর্ষ আদালতের কাছে তার মধুরেণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে গড়ে উঠবে। যার সুফল কুড়াবে পরবর্তী প্রজন্ম যারা ঈশ্বরের এক অদ্ভূত লীলায় অন্য ধরনের শারীরিক গঠন নিয়ে জন্মেছেন। অথচ শরীরের এই অন্য ঘরানাকে কোথাও কদর্যতা বলে মনে করা হয়েছে। তাদের যৌনাচারের অধিকারকে পাপ বলে মনে করা হয়েছে।

‌ওদের দেখা যায় আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত, হরদম। তাও কেমন যেন মঙ্গলগ্রহের বাসিন্দার মতো ওদের দূরে ঠেলে দেওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে আমার-আপনার সকলের মধ্যে। আসলে এটাই হয়তো আমাদের সমাজ। যারা হঠকে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে আমাদের মধ্যে কবেই এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে বসে আছে। অথচ ওরাও কিন্তু কোনও কিছুতেই কারও থেকে কম যায় না। পড়াশুনা থেকে সংস্কৃতি সবেতেই ওরা সাবলীল।

নিজেদের ধ্বজা তুলে ধরে আর পাঁচজন প্রতিষ্ঠিত মানুষের মতোই। তাও বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ওদের আলাদা করে রাখার প্রবণতা পুরোদমে জারি থাকে সমাজে। ছোটবেলা স্কুলে পড়ার সময় এরকম একজন বন্ধুকে পেয়েছিলাম বেশ মনে পড়ে। পড়াশুনায় তুখোড়। ক্লাসে ফার্স্ট নয় সেকেন্ড হত বরাবর। অথচ ওর মধ্যে একটা অদ্ভূত মেয়েলি স্বভাব ছিল।

ছোট বয়সে ঠিক বুঝত না কেউই। ফলে ওকে নিয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টা করা ক্লাসে একরকম রেওয়াজ হয়ে উঠেছিল। ছোট ছেলে মেয়েরা না হয় সেসময় ওই বন্ধুটির হরমোনের খেলা ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। কিন্তু স্যার বা ম্যাডামরা পর্যন্ত ওর সঙ্গে কেমন একটা ব্যবহার করত। নিয়ম করে সব পরীক্ষায় ভালো ফল করা ছেলেটির কি এই ব্যবহার আদৌ প্রাপ্য ছিল। একেবারেই নয়। কিন্তু কেউ ওর সম্মান দিতে পারে নি।

হয়তো সমাজ ব্যবস্থাতেই থেকে গিয়েছিল গলদ। যাতে পুরুষের মেয়েলি আচরণকে অপরাধ বলে মনে হত। কিন্তু এটাই ছিল সিস্টেম। যা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের যুগের পর যুগ পেরোতে হল। সরকারি স্বীকৃতি লাভের পরেও কবে যে এই হেনস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ মুক্তি ঘটবে তাও বলা যাচ্ছে না। তবে কালো মেঘ কেটে আকাশ যে রৌদ্রকরোজ্জ্বল হচ্ছে তা বলা যেতেই পারে।

Advertisement
----
-----