পার্থসারথি গুহ: সব জায়গাতেই সেই চেনা ছবি। মায়ের কোল খালি করে সন্তানের মৃত্যু কিংবা কোথাও স্ত্রীর সিঁদুর মুছে দিয়ে স্বামীর অপমৃত্যু। উলটো ঘটনাও আছে। সন্তানদের রেখে অভিভাবকরাই সেখানে বলি হন অকস্মাৎ ধেয়ে আসা কোনও দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তাঁদের হাহাকার বিচলিত করে তোলে তামাম মনুষ্যজাতিকে। কিছুদিন সেই হাহাকার ও অস্ফুট কান্না যেন তাড়া করে বেড়ায় সমাজকে। তারপর যথারীতি সব ভোঁ ভাঁ। শুধু একটা কথাই আকাশে বাতাসে ভেসে ওঠে ফিসফিস করে, যার গেল, তার গেল।

সত্যি তো নাগেরবাজারে বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল যে সাত বছরের শিশু বিভাস ঘোষ তার পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদে পুজোর কিছুদিন আগেই মুখরিত হয়ে উঠেছিল বাংলার আকাশ বাতাস। কদিন আগেই গুলিবিদ্ধ হয়ে যে একজোড়া তরতাজা ছাত্রের মৃত্যু হল, ইসলামপুরের দাড়িভিটের সেই রাজেশ সরকার, তাপস বর্মনদের মা-বাবা, পাড়া, পড়শী- স্বজনের বুক ফাটা চিৎকারের অনুরণন এখনও শোনা যায় কান পাতলে।

Advertisement

যথারীতি রাজনৈতিক কাজিয়ায় মত্ত শাসক ও বিরোধী শিবির। পুলিশ গুলি চালিয়েছে কি চালায়নি, বোমার উৎস কি, তা প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত সব শিবিরই। মোদ্দা কথা রাজনীতির পালের হাওয়া নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসাই প্রধান লক্ষ্য এই রাজনীতির কারবারীদের। কিন্তু যে পরিবারগুলির সন্তান এভাবে অকালে ঝরে গেল তাদের প্রকৃত মানসিক অবস্থা কি আদৌ কেউ খতিয়ে দেখছে? মনে হয় না। কারও এত সময় আছে এদের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার। খালি গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে মুখ দেখাতেই বা নিজেদের আস্ফালন জারি করতেই সবাই ব্যস্ত। কিছুদিন এই শোকতাপ থাকবে। তারপর কোনও এক নতুন ঘটনা এসে হাজির হয়ে নিমেষেই সব ভুলিয়ে দেবে।

‌আর সেই ভুলিয়ে দেওয়ার রসদের ডালি নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে এসে গিয়েছে শারদ উৎসব। এই তো কিছুদিন আগেই মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়ল। তাতে যে ৩ জন হতভাগ্যের মৃত্যু হল, কজনের মনে আছে তাদের কথা। আর মনে করার কোনও দায়ও নেই তো। বাগরি অগ্নিকাণ্ডে যে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হলেন তার খেসারত তো আর অন্য কেউ দিতে পারবে না। সরকার নিদেনপক্ষে ক্ষতিপূরণ দিয়েই খালাস।

পুজোর আনন্দে ভরপুর তিলোত্তমার এক প্রান্ত বেহালায় যখন মাঝেরহাট ব্রিজ ভাঙনের অন্যতম শিকার সৌমেন বাগের মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে তখন তার পাশে গিয়ে আর কেই বা সান্তনা দেবে। আসলে উলুখাগড়াদের জীবনযাত্রাই যে এইরকম। রাজা-রাজরা রা অনেক কিছুই বলবে, কিন্তু শোকসন্তপ্ত পরিবারের কষ্ট, দুর্দশা রয়ে যাবে তাদের ভাঙা আস্তাকুড়েই।

এই ছবির কিন্তু কোথাও কোনও ব্যতিক্রম নেই। যুগ যুগ ধরেই এই রেওয়াজ চলে আসছে। কমিউনিস্ট চিনের তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ারের রাষ্ট্রশক্তির নিপীড়নে শহিদ হওয়া ছাত্রদের পরিবার, গুজরাটের ভয়াবহ দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তরা, নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া মানুষগুলি আর ইসলামপুর-নাগেরবাজারের ঘটনায় মৃতদের পরিবারের হাহাকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এরকম ঘটনা আরও ভুরি ভুরি রয়েছে, যেখানে ক্ষমতাবানদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা উজাড় করেছে অসংখ্য তরতাজা প্রাণ। কোথাও আবার রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দেওয়া সংগঠনের হাতে অকাতরে খুন হয়েছে বা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাজনীতির ক্রিমটা হয়তো অনেকেই ভাগ করে নিয়েছেন, কিন্তু যার গেল, তার গেল’র মোচড় থেকেই গিয়েছে।

শাসকের রঙ পাল্টালেও মানবিকতার জার্সি কেউই গায়ে চাপাচ্ছেন না। যা চোখে দেখা যাচ্ছে তাকে ছদ্ম নামাবলী বললেও অত্যুক্তি হবে না। এই জন্যই হয়তো বীতশ্রদ্ধ কিছু মানুষ সবসময় প্রলাপ বকতে থাকে, যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। রাবণ প্রজা হিতৈষী ছিলেন না, এমন কথা বলেন না প্রবল রামভক্তরাও। কিন্তু, সীতা হরণের মতো এক ভুল কূটনৈতিক চালে মাত হয়েছিলেন দশানন। এদেশে অবশ্য নোটবন্দি বা জিএসটি নিয়ে অসংখ্য বিরুদ্ধ মত থাকলেও রাষ্ট্রশক্তি তাকে পাত্তাই দিতে চায় নি। প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদের কথাকেও অবজ্ঞা করা হয়েছে ঠুনকো যুক্তির বুনন খাড়া করে। সংখ্যাগরিষ্ঠতাই এভাবে নানা আঙ্গিকে শক্তি জুগিয়ে আসছে ক্ষমতাবানদের। আম আদমির কথা শোনার অত সময় বা ধৈর্য কোথায় তাদের।

‌রাজ্য থেকে দেশ, মহাদেশ থেকে উপমহাদেশ, উন্নত থেকে উন্নতশীল সব জায়গাতেই চিত্রিত হয়ে চলেছে সেই এক ছবি। রাজা যে পোশাকেই থাকুন না কেন, তার বা তাদের মনের দম্ভ একই থেকে যাচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের রোজনামচা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। অথচ মানুষ যেভাবে তার সরকারকে চায়, যে আস্বাদন পেতে চায় তা কিছুতেই ধরাছোঁয়া যায় না। শাসক আর শাসিতের সম্পর্কে আবদ্ধ না থেকে তা রূপান্তরিত হয় শাসক আর শোষিত তে।

এর থেকে কিভাবেই আর ব্যতিক্রম থাকে আমাদের রাজ্য। দীর্ঘ বাম জমানার অবসানে কাংখিত পালাবদল একদিকে যেমন উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ বয়ে নিয়ে এসেছে, ঠিক তেমনই শাসকের সঙ্গে শাসিতের সম্পর্কের খুব বেশি উন্নতি ঘটাতে পারে নি। ফলে প্রজার মন না বুঝে এগোতে গিয়ে অনেকক্ষেত্রেই হয়তো সেটব্যাক হচ্ছে। আর্থিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এই সরকার নিজের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার ঘেরাটোপ এড়িয়ে প্রচুর উন্নয়ন ঘটিয়েছে এ কথা যেমন দিনের আলোর মতো পরিস্কার ঠিক তেমনই গণতান্ত্রিক পরিসর ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা উদার তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বিরোধীদের রাজনীতি ইতিবাচক কি নেতিবাচক সে পথে না হেঁটে এটুকু বলা যায় আরও একটু উদার হওয়ার প্রয়োজন শাসক পক্ষেরই। দলীয় মাতব্বরদের কথায় প্রভাবিত না হয়ে সরকার যদি আরও জনসংযোগ ঘটানোয় উদ্যোগী হয় তাহলে হয়তো ফাঁকফোকর অনেকটাই ঢেকে ফেলা সম্ভব। বিরোধীদের ব্যাটে যাতে রান না আসতে পারে সেজন্য শাসককেই টানা ইয়র্কার লাইনে বল করে যেতে হবে।

‌পঞ্চায়েত ভোটকে ঘিরে আগে ও পড়ে যে হিংসার ঘটনা ঘটেছে তা কখনই অভিপ্রেত নয়। এসব নরম ডেলিভারি কিন্তু শাসকের হাত মোটেই মজবুত করবে না। সর্বাগ্রে সেটাই মনে রাখতে হবে। রিগিং, বুথ দখল, ছাপ্পা ভোটের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘ লড়াই বর্তমান শাসক দলকে লড়তে হয়েছে তার উলটপুরাণ হলে কিন্তু আহত হবে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সংবেদনশীল মানুষ। তোল্লাই দেওয়া, আত্মতুষ্টিতে ভরপুর পাত্র-মিত্রর কথায় প্রভাবিত না হয়ে সরকারের উচিত রাজ্যবাসীর মনের গহনে যাওয়া। অনেকটা আগেকারদিনের রাজাদের ছদ্মবেশে প্রজার কাছে যাওয়ার মতোই জনতা জনার্দনের নাড়ির চাপ বুঝতে ও হাঁড়ির খবর মাপতে আরও নিখুঁত হতে হবে সর্বোচ্চ নের্তৃত্বকে।

----
--