স্রোতের বিপরীতে গিয়েই অনেকের অনুপ্রেরণা রূপান্তরকামী জিয়া

সোয়েতা ভট্টাচার্য, কলকাতা: যিশু থেকে জিয়া ৷ ২৫ বছরের এই সফরের উল্লেখ করলে বেশিরভাগটাই রয়েছে সংঘর্ষের কথা ৷ শুধু সমাজ নয় জিয়ার সংঘর্ষ ছিল নিজের পরিবারের সঙ্গেও ৷ কারণ জিয়া আর পাঁচ জনের মতো নয় ৷ তবে ২৫ বছরের জিয়ার জীবন যুদ্ধর একটাই লক্ষ ছিল , নিজেকে সমাজের মাঝে সুপ্রতিষ্ঠিত করা ৷ সেই যুদ্ধে শেষমেশ রুপান্তরকামী জিয়া সফলতার স্বাদ পেল ৷

এখন সে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারের টেকনিশিয়ান ৷ সব সময় তিনি চাইতেন যাতে নিজের জীবনকে মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে পারেন ৷ তাই জীবনে পাওয়া কোনও সুযোগ হাত ছাড়া করেনি ২৫ বছর বয়সি জিয়া ৷ এই সফলতা পেয়ে আরও একবার রুপান্তরকারী ওটি টেকনিশিয়ান জিয়া প্রমাণ করল তারা সমাজের অন্য মানুষদের থেকে কোনও অংশে কম নয় ৷

এর আগেও মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আরও অনেকে কখনও শিক্ষকতায় কখনও আবার আইনের জগতে তারা বারবার নিজেদের প্রমাণ করেছে ৷ মালদার বাসিন্দা জিয়া ছেটবেলা থেকেই মেধাবী ৷ তবু বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের টিপ্পনী কোনও দিনই পিছন ছাড়েনি ৷ এমনকি জন্মদাতা বাবা ও পরিবারের সদস্যরা তার এই যুদ্ধে সঙ্গে থাকার সাহস দেখাননি ৷ তারা জিয়াকে তাঁর পরিচয় গোপন রেখে বাঁচার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানায় জিয়া ৷ কিন্তু হাল ছাড়েনি এই জীবন-যোদ্ধা ৷ তাঁর লড়াই সমান তালে চলেছে ঘরে বাইরে ৷

- Advertisement -

ছোট বোন মামনি দাস ছাড়া পরিবারের কেউই তাকে মেনে নিতে পারেনি ৷ একসময় বাবা তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেন তবে টিউশন পড়িয়েও নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যায় রুপান্তরকামী এই নারী ৷ প্রথম আঘাত সমাজ নয় নিজের পরিবারের কাছ থেকেই পায় জিয়া ৷ তবে বাবার অসুস্থতার সময় নিজের কর্তব্য থেকে সরে আসেননি জিয়া ৷ রাস্তায় , ট্রেনে ভিক্ষা করে অন্য বৃহন্নলাদের মতো টাকা উপার্জন করে বাবার চিকিৎসা করায় সে ৷ তার পরও পরিবারের মন পেতে অসফল হন তিনি ৷ তখনই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে ৷

পরিবারের দেওয়া নাম ত্যাগ করে যিশু থেকে জিয়া হয়ে ওঠে সে ৷ পড়াশোনা করে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির খোঁজ শুরু করে জিয়া ৷ তবে কোনও সংস্থাই তাকে চাকরি দেয়নি ৷ কারন তার দোষ একটাই তিনি রুপান্তরকামী নারী ৷ জিয়া দাস বলেন,”ছোট্ট থেকে অপমান আর বঞ্চনাই তাঁকে জুগিয়েছে হার-না-মানা লড়াইয়ের জেদ। সেই জেদের জোরেই আজ নিজেকে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি আমি ৷ একদিন কেউ আমাকে মানুষ বলেই গণ্য করত না তবে আজ সমাজ আমাকে নিয়ে কি বলে তার পরোয়া করি না ৷ সমাজের সামনে প্রকাশ্যে লড়াই ছাড়া অন্য কোনও রাস্তা ছিল না ৷ তাই রুখে দাড়ানোর চেষ্টা করি ” ৷ তার এই চেষ্টাই তাকে আজ দেশের প্রথম রুপান্তকারী নারী হয়ে উঠতে সাহায্য করে ৷

জিয়া জানায় তাঁর স্বপ্নের উড়ান এখানেই শেষ নয়, আগামিদিনে সে একজন সফল নার্স হয়ে ওঠে মানুষের সেবায় নিজের জীবন কে সমর্পন করতে চায় ৷ তিনি বলেন,”নিজের পরিচয় লুকোনোর পরামর্শ আমাকে সব থেকে বেশি আঘাত দেয় ৷ সেই সময় একটাই প্রশ্ন করছিল মন যে আমার দোষটা কোথায় ৷ তবে এই সমাজ আমার কষ্ট কোনওদিন বুঝবে না তা বুঝেই গিয়েছিলাম ৷ তার পর আর ফিরে তাকাইনি ৷ নিজের পায়ে দাঁড়ানোই ছিল আমার লক্ষ ”৷

এই বেসরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্য দুনিয়া যেন খুলে গিয়েছে জিয়ার ৷ তার আত্মবিশ্বাস যেন অন্য মাত্রা ছুঁয়েছে ৷ তিনি মনে করেন অন্য রুপান্তরকামীদের জীবনেও যেন এই পরিবর্তন আসে ৷ যোগ্যতা দিয়ে সবাই নিজেকে প্রমাণ করুক ৷ তার এই পথ সহজ কোনওদিনও ছিল না তবে আজ সফলতার মুখ দেখে জীবনের অনেক আঘাতের দাগ আসতে আসতে ফিকে হচ্ছে ৷

Advertisement ---
---
-----