বাগানের এ এক অন্য মালির গল্প৷ ছবি- সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়

সুভীক কুন্ডু, কলকাতা: ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে৷ কিন্তু মোহনবাগান প্রেমে ছেদ পড়েনি৷ বেঁচে থাকার তাগিদে উপার্জনের মধ্যেও উঠে এসেছে তাঁর সাধের বাগান৷ যে বাগানেও রয়েছে ফুল ও মালি৷

মোহনবাগানের ভোলা ময়ড়া৷ এই নামেই পাড়ায় পরিচিত৷ মানিকতলার মোড়ে এসে ভোলার দোকান জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে সবাই৷ ব্লাড ব্যাঙ্কের ফুট ধরে মিনিট দুই বাগমারির দিকে হাঁটলেই বাঁ-দিকে ছোট্ট দোকান ভোলার৷ সেখানেই বছরের ৩৬৫ দিন সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত চলছে ভোলার ফুলের ব্যবসা৷ এই এক ফালি দোকানই ভোলার সবকিছু৷ সেই দোকানেই ১৫ বছর ধরে চলেছে মোহনবাগানের উপাসনা৷ চলছে সাধের ক্লাবকে নিয়ে আড্ডা, গল্প ও তর্ক৷

ছোট্ট ফুলের দোকান রাঙানো রয়েছে মোহনবাগানের সবুজ-মেরুন রঙে৷ ফুটপাতের উপর টিনের চালার দোকান৷ যার কোথাও আঁকা বাগানের পালতোলা নৌকো, কোথায়ও আবার লেখা ‘২৯ জুলাই আমাদের মাতৃদিবস’৷ ফি বছর নতুন করে দোকান রঙ করান সবুজ-মেরুন রঙে৷ সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে দেড় দশক ধরে৷

ছোটবেলা থেকে মোহনবাগান অন্ত প্রাণ ভোলা৷ দাদার হাত ধরেই ময়দানে খেলা দেখতে যাওয়া শুরু৷ গ্যালারিতে দাদার কাঁধে চেপেই ফুটবলারদের চেনা শুরু করেছিলেন৷ মোহনবাগানের খেলা দেখতে গিয়ে মারও খেয়েছেন বেশ কয়েকবার৷ দোকানের বিকিকিনির মাঝে নিজেই সেই গল্প শোনালেন ভোলা৷

দোকান হোক বা বাড়ির ঠাকুরের বেদী, সবুজ-মেরুন রঙে রাঙানো সবকিছু৷ ছবি- সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়

‘মাউন্টেন পুলিশের তাড়া খেয়ে আমাকে কোলে তুলে গ্যালারিতে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন দাদা৷ গ্যালারিতে আমাকে লুফে নিয়েছিল দাদার বন্ধুরা৷ দাদা সেদিন লিগের ম্যাচ দেখতে পারেনি৷ কিন্তু আমি পেরেছিলাম৷ তখন বয়স মাত্র নয়৷ সেকি অনুভূতি৷ পুরনো স্মৃতির সব তো আর মনে নেই৷ কিন্তু ঐ দিনটা মনে গেঁথে রয়েছে৷’ এক নিঃশ্বাসে স্মৃতিরোমন্থন বছর পঁয়তাল্লিশের ভোলার৷

সঙ্গে জুড়লেন ‘একবার গন্ডগোলে লাঠি চার্জ হল৷ পিঠে লাঠির বাড়ি৷ এরপর থেকে ভয়ে দাদা আর কোনও দিন মাঠে নিয়ে যেতেন না৷ সেই ঘটনার পর মাঠে তেমন আর যাওয়া হয়নি৷ পরে যখন এই দোকান দিই, তখনই ঠিক করেছিলাম এটাই হবে আমার মাঠ এবং মন্দির৷ সহজে কি ফুটবলের মায়া কাটানো যায়!’

পড়াশোনার মাঝেও চুটিয়ে পাড়া ফুটবল খেলেছেন৷ একসময় ভোলার ফুটবল পাগলামো ঘোচাছে হস্টেলে রেখেও পড়াশোনা করানোর ভাবনা ছিল তাঁর পরিবারের৷ সময়ের অভাবে ক্লাবের প্রতি ভালবাসার গ্রাফটা কমলেও দোকানের ভাবনা আসতেই ক্লাবের সবুজ-মেরুন রঙকেই বেছে নেন ভোলা৷ শুধু দোকানই নয়, একফালি ছোট্ট ঘরের দেওয়ালও সবুজ-মেরুন রঙে রাঙানো৷ এক দেওয়ালে আবার পালতোলা নৌকা আঁকা৷ ঠাকুরের পুজোর বেদীও মোহনবাগানের সবুজ-মেরুন রঙে রাঙানো৷ ভোলার দুই ছেলেও মোহনবাগান পাগল৷ ভোলার মা’ও বাগানের অন্ধ সমর্থক৷ তাই ক্লাবকে ভালোবেসে ভোলার এই পাগলামো মেনে নিয়েছে তাঁর পরিবার৷

প্রতি বছর নিজের মতো করে মোহনবাগান দিবস পালন করে এই বাগান ভক্ত ৷ তবে সেটা ২৯ জুলাই নয়৷ তার পর সপ্তাহের ছুটির দিনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন ভোলা৷ এ বছরে তিনজন ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসার জন্য অর্থ তুলে দিয়েছেন ভোলা ও স্থানীয় মানিকতলা মোহনবাগান সোলজার্স ক্লাব৷ ২০১৫ সালে মোহনবাগান আই লিগ জেতার পর পথ চলতি মানুষকে ১০ হাজার টাকার রসগোল্লা খাইয়েছেন এই বাগান সমর্থক৷ এবার কলকাতা লিগ জিতলেও কিছু করার ভাবনা রয়েছে এই বাগান ‘মালির’৷

----
--