মানব গুহ, কলকাতা: এ কোন রাজ্যে বাস করছি আমরা? যেখানে বিডিও অফিস, এসডিও অফিস ও জেলাশাসক দফতর শাসন করে রাজনৈতিক দলের গুন্ডা বাহিনী৷ যেখানে পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে মহিলা সাংবাদিককে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে দুষ্কৃতী বাহিনী৷ সাংবাদিকদের ঘড়ি, মোবাইল, ক্যামেরা কেড়ে নিচ্ছে জেলাশাসকের দফতরে পুলিশের সামনে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করা গুন্ডারা৷ আমরা বাংলায় আছি তো? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

পরিবর্তনের বাংলার মুখে চুনকালি মাখাল আলিপুর জেলাশাসকের দফতর৷ জেলাশাসকের দফতরটা এখন গুন্ডাবাহিনীর স্বর্গরাজ্য৷ এখানে জেলাশাসক নয়, দাপট শুধুই দুষ্কৃতীদলের৷ অভিযোগের তির শাসকদলের গুন্ডাবাহিনীর দিকেই৷ এখানে পুলিশ, জেলাশাসক বা সরকারি আধিকারিকদের নয়, মস্তানদের কথায় ওঠে বসে৷

দিনকয়েক আগেই এই আলিপুর জেলাশাসকের দফতরে মনোনয়ন পেশ করার ছবি তুলতে গিয়ে শাসক দলের মস্তানদের হাতে অপহৃত হন কলকাতার এক পত্রিকার চিত্রসাংবাদিক৷ জেলাশাসকের দফতর থেকে বিশাল পুলিশ বাহিনীর সামনে দিয়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় জেলাশাসক দফতরের পাশেই গুন্ডাবাহিনীর নিজস্ব আস্তানায়৷ তারপর, তাকে উলঙ্গ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, বাংলায় সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে না৷

সোমবার একদিনের মনোনয়নে আরও লজ্জাজনক অধ্যায় দেখল বাংলা৷ পরিবর্তনের বাংলার মুখে চুনকালি মাখাল আলিপুর জেলাশাসকের দফতরের ঘটনা৷ মনোনয়ন পেশ করার সংবাদ করতে যাওয়া এক মহিলা সাংবাদিককে জেলাশাসকের দফতরের ভিতর থেকেই রীতিমত অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ঘরে৷ প্রায় এক ঘন্টা আটকে রাখা হয় তাকে৷ এক ঘন্টা তার কোন সন্ধান ছিল না৷ চড় থাপ্পড় মেরে কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল৷ জেলাশাসক দফতরের ভিতরেই কয়েকজন পুরুষ ধস্তাধস্তি করে ওই মহিলা সাংবাদিকের সঙ্গে৷ বলাই যায়, প্রায় শ্লীলতাহানি করা হয় ওই সাংবাদিকের৷ পুরোটাই ঘটে বিশাল পুলিশ বাহিনীর সামনে৷

পুরো ঘটনা ঘটে পুলিশের চোখের সামনে৷ তবু, কেউ কোন বাধা দিতে আসেন নি৷ শাসক দলের নেতা কর্মীদের কিছু বলার সাহস কলকাতার পুলিশের আছে কি? উত্তরটা আজ সবাই জানেন৷ সোমবার সকাল থেকে জেলাশাসকের দফতরের সামনে ছিল কড়া পুলিশ পাহারা৷ মাছিও গলতে পারবে না এমন পাহারা৷ আটকানো হচ্ছিল সাংবাদিকদের৷ কড়া পরীক্ষা করা হচ্ছিল বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস প্রার্থীদের৷ তবু, সবার চোখের সামনে বিনা হেলমেটের বেশ কিছু যাত্রী অবলীলায় ঢুকে পড়েছিল জেলাশাসকের দফতরে৷

 

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই জেলাশাসকের দফতর চলে যায় সেই সব গুন্ডাবাহিনীর কব্জায়৷ জেলাশাসকের দফতরের পুরো ক্ষমতা চলে যায় সেই সব মস্তানদের হাতে৷ বিশাল পুলিশ বাহিনীর চোখের সামনে৷ তারপর যা হবার তাই হল৷ একের পর সাংবাদিক হেনস্থা হলেন তাদের হাতে৷ অভিযোগ এই গুন্ডাবাহিনী পুরোটাই শাসকদলের৷ গোটা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি সত্বেও এত মস্তান ঢুকলো কি করে? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

মহিলা সাংবাদিকের হেনস্থার পাশাপাশি বাংলার বহূল প্রচারিত এক সংবাদপত্রের সাংবাদিককেও টেনে হিঁচড়ে জেলাশাসকের দফতর থেকে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের একটি টালির ঘরে৷ হ্যাঁ, সেই বিশাল পুলিশ বাহিনীর সামনে দিয়েই৷ মারধর করে কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল, ঘড়ি, ক্যামেরা৷

সব ক্ষেত্রেই অভিযোগের তির শাসকদলের গুন্ডাবাহিনীর দিকে৷ মহিলা অপহরণের ক্ষেত্রে ভবানীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে অজ্ঞাত পরিচয় গুন্ডাবাহিনীর বিরুদ্ধে৷ আলিপুর জেলাশাসকের দফতরে গুন্ডাগিরি করলেও, তাদের সন্ধান যে পুলিশ পাবে না তা সবাই জানে৷ পুরুষ সাংবাদিকের তরফ থেকেও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে৷

দক্ষিণ ২৪ পরগণার জেলাশাসক ওয়াই রত্নাকর রাও সাংবাদিকদের ফোন ধরেন নি৷ কি করেই বা ধরেন৷ নিজের দফতরেই তার যে কোন ক্ষমতা নেই, তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে ভোটের মনোনয়ন জমা করার দিন থেকেই৷ তারপর, বিশাল পুলিশ বাহিনীর সামনে জেলাশাসক দফতরের মধ্যেই একের পর এক সাংবাদিক হেনস্থায় জেলাশাসকের ক্ষমতা যে কতটা করুণ তাও পরিষ্কার৷

বাংলায় পরিবর্তনের মুখে আজ চুনকালি মাখাল আলিপুর জেলাশাসকের দফতর৷ পরিবর্তনের সরকারের মুখেও এই কালি লাগলো৷ তাহলে পরিবর্তনে কি লাভ হল বাংলার? হূগলির হরিপালে ও পশ্চিম বর্ধমানের দূর্গাপুরেও শাসকদলের নেতা কর্মীদের হাতে মার খেয়ে সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় সাংবাদিকদের৷

একের পর এক ঘটনায়, প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷ শাসকদলের গুন্ডাবাহিনীর হাতেই যে পরিবর্তনের পরিবর্তন হতে পারে, আশঙ্কার কথা বলছেন শাসকদলের নেতারাই৷ তবে, ভোটের শুরুর দিন থেকেই যে অরাজকতা দেখছে রাজ্যবাসী, তাতে পরিবর্তনের আশঙ্কিত হবার যথেষ্ট কারণ থাকছে৷

----
--