এবিভিপির প্রস্তাবে জাতীয় শিক্ষানীতিতেও কি ধরবে গেরুয়া রঙ?

কলকাতা: দেশের নয়া শিক্ষানীতি কেমন হতে পারে, সে বিষযে জনসাধারণের মতামত জানতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। দেশের প্রতিটি রাজ্যের প্রতি জেলার মানুষই দেশের নয়া শিক্ষানীতি প্রসঙ্গে যাতে মতামত ব্যক্ত করতে পারেন, এমনকী পড়ুয়ারাও যাতে তাদের পরামর্শ জানাতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে শহরে এসে জানিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি জুবিন ইরানি। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘মাই গভ ডট ইন’ ওয়েবসাইটে সকলেই এ বিষয়ে তাঁদের মত জানাতে পারেন৷ কিন্তু এই গণতান্ত্রিকতার আবহেও গেরুয়া শিবির তাদের প্রাধান্য বজায় রাখতে চাইছে৷ বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপির সর্বভারতীয় প্রেসিডেন্ট নাগেশ ঠাকুর কিন্তু ইতোমধ্যেই একডজন প্রস্তাব পেশ করে ফেলেছেন স্মৃতি ইরানির কাছে। dipendu-paul

প্রশ্ন হল, গেরুয়া শিবিরের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে কি নয়া শিক্ষানীতিতে রূপায়ণ করতে পারবেন স্মৃতি? সম্প্রতি গোলপার্কে রামকৃষ্ণ মিশন আয়োজিত “নিউ এডুকেশন পলিসি” সংক্রান্ত এক জাতীয় আলোচনাসভায় যোগ দিতে এসে নাগেশ ঠাকুর বলেন, “স্মৃতি ইরানিকে বলব, জাতীয় শিক্ষানীতি নির্ধারণ করার আগে যেন তিনি আমাদের এই প্রস্তাবগুলি খতিয়ে দেখেন।” মঞ্চে তখন খোদ স্মৃতি ইরানি। পরিস্থিতি সামলাতে তখনকার মতো হেসে তাঁকে সায় দিতে হল নাগেশ ঠাকুরের কথায়। কিন্তু তাঁর অভিব্যক্তিতে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। কারণ, তিনি নিজেও একসময় বলেছেন, ভারত বিবিধ ভাষাভাষী ও নানা সংস্কৃতির দেশ। আবার নাগেশ ঠাকুরদের মতো কট্টর গেরুয়াপন্থী শিবিরের একাংশের মত, হিন্দুত্ববাদকে গুরুত্ব না দিয়ে নয়া শিক্ষানীতি কী করে গঠন করা হতে পারে? সুতরাং এ দুয়ের বিরোধ নয়া শিক্ষানীতির স্বচ্ছ রূপায়ণে যে বড় বাধা হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়৷

(ভারতে উচ্চশিক্ষা বরাবরই বিশ্বমানের, ভাষাই যা বাধা: স্মৃতি)

এবিভিপির সর্বভারতীয় প্রেসিডেন্টের কী বক্তব্য? কেন্দ্রের কাছে পেশ করা তাঁর এক ডজন সুপারিশের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে, একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের সুপারিশ। কী করবে এই কমিশন? নাগেশ ঠাকুরের ব্যাখ্যা, এই কমিশনই দেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ামক সংস্থা হবে। এই কমিশন হবে স্বশাসিত। অনেকটা নির্বাচন কমিশনের মতো। নাগেশ ঠাকুরের এই বক্তব্যে সায় দিয়েছেন ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্রিডিয়েশন কাউন্সিল(ন্যাক)-এর ডিরেক্টর ডি পি সিংও। তবে তাঁর পরামর্শ, নতুন কমিশন গঠন করে আবার বর্তমান নিয়ামক সংস্থাগুলির অস্তিত্ব যেন বিলুপ্ত করে না দেওয়া হয়। ডি পি সিং বলেন, “আমি মনে করি একটি স্থায়ী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক তৈরি করাটা জরুরি। যারা শিক্ষাক্ষেত্রের যাবতীয় প্রতিকূলতার সবদিক খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। কিন্তু তাই বলে রাজ্যের বর্তমান নিয়ামক সংস্থাগুলিকে যেন বিলুপ্ত না করে দেওয়া হয়। যেমন ‘ন্যাক’-এর মতো সংস্থা, যা হল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের স্ট্যাটুইটারি বডি। জাতীয় স্তরের এই আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন দেশের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা। যারা নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তাদের মতামত জানিয়েছেন স্মৃতির মন্ত্রককে।

- Advertisement -

নাগেশ ঠাকুর ও তাঁর গেরুয়া শিবির অবশ্য এতশত ভাবতে নারাজ। স্মৃতি জুবিনকে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, নয়া শিক্ষানীতিতে যেন ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃতির ‘উপযুক্ত’ প্রতিফলন হয়। এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব৷ কিন্তু নাগেশবাবুরা ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’ বলতে যে মোহন ভাগবতদের নির্ধারিত ‘সংস্কৃতি’র গাইড বুকের বাইরে কিছু নয়, সেটাই ভয়ের৷ তাঁর আরও বক্তব্য, পাশ্চাত্যের ভাষা নয়, ভারতীয় ভাষাতেই যেন উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারেন পড়ুয়ারা। স্কুল বা কলেজ স্তরেই নয়, স্নাতকোত্তর ও গবেষণাও যেন ভারতীয় ভাষাতেই করা সম্ভব হয়। এও অতি ভালো কথা৷ কিন্তু উচ্চশিক্ষার স্তরে সে সুবিধা কি আছে? আগেভাগে বন্দোবস্ত না করেই যদি ‘সংস্কৃতি’ বজায় রাখতে গিয়ে এহেন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে উচ্চশিক্ষার হাল কী হবে তা কল্পনা না করাই ভাল৷

abvp-2
এবিভিপির সর্বভারতীয় প্রেসিডেন্ট নাগেশ ঠাকুর(মাঝখানে)

যে ভারতীয় ভাষাতেই একজন পড়ুয়া উচ্চশিক্ষা লাভ করতে চেয়ে থাকুক না কেন, সংস্কৃত ভাষাকে সেই তালিকায় রাখতেই হবে, প্রস্তাব এবিভিপির সর্বভারতীয় প্রেসিডেন্টের। এখানেই শেষ নয়, সকলের জন্য সুলভে শিক্ষার ব্যবস্থা করতেও স্মৃতির কাছে দরবার করেন তিনি। তবে তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, রাজ্যের ধুঁকতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে আর্থিক সাহায্য করে গবেষণারত পড়ুয়াদের সাহায্য করা। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও অবশ্য একমত। স্মৃতি নিজেও আক্ষেপ করে বলেছেন, আজকাল অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নিজস্ব গবেষণাগার তৈরি করার আগে সুইমিং পুল তৈরি করে বিজ্ঞাপন করার দিকে নজর দেয়।

(অনলাইনেই দশম-দ্বাদশের বোর্ড পরীক্ষা, আসছে ‘স্বয়ং’)

গেরুয়া শিবিরের আরও দাবি, বেতন কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনা হোক। সকল পড়ুয়ার জন্য এক বেতন কাঠামো অবিলম্বে বন্ধ করা হোক। কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনও ছাত্র ভর্তি হলে, তার আর্থিক অবস্থা খতিয়ে দেখে তবেই বেতন নির্ধারন করা হোক। প্রতি বছর এই কাঠামো রিভিউ করে দেখবেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আধিকারিকেরা।

তবে এই নীতি লাগু করে পঞ্চায়েত ও ব্লক স্তরে বিজেপি নেতাদের প্রাধান্য বাড়ানোই যে আসল লক্ষ্য গেরুয়ার, সে কথা মানছেন শিক্ষামহলের একাংশ। কেননা কোন পড়ুয়া আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে, সেটা কে ঠিক করে দেবে? সেটা কি স্থানীয় এলাকার কাউন্সিলাররাই ঠিক করবেন? নাকি ওই পড়ুয়ার ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট খতিয়ে দেখা হবে? সে নিয়ে কোনও স্পষ্ট রূপরেখা অবশ্য নাগেশবাবুদের হাতে নেই৷

পূর্বসূরীদের মতোই নাগেশ ঠাকুরও বলেছেন, প্রাচীন ভারতে নালন্দা ও তক্ষশীলার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক যেমন ছিল, অধুনা ভারতেও তা করে দেখাতে হবে। দেশের শিক্ষার তিন মূল ভিত্তি হওয়া উচিত- জ্ঞান, যোগ্যতা ও রোজগার।

স্মৃতি অবশ্য জানাননি এইসব প্রস্তাবই জাতীয় শিক্ষানীতিতে লাগু হবে কি না৷ গেরুয়া শিবিরের মত বজায় রেখেও যদি তিনি সকলের মতামত মেনে নতুন শিক্ষানীতি রূপায়ণ করতে পারেন, তবে আখেরে লাভবান হবে দেশের পড়ুয়ারা৷ কিন্তু দলের ছাত্র সংগঠনের মতকেই যদি শিরোধার্য করতে হয়, তবে শিক্ষানীতিতেও গেরুয়াকরণেক ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠবে৷ তা পড়ুয়াদের স্বার্থ কতখানি দেখবে, আর শিক্ষা অঙ্গনে বিজেপির আগ্রাসনেই বা কতটা সহায়ক হবে, সে বিতর্কের অবকাশ অবশ্য থেকেই যাচ্ছে৷

(‘ই-পাঠশালার’ পর স্মৃতির লক্ষ্য ই-ইউজি-পিজি’)

Advertisement
-----