একজন চলে গেলেন, আর একজন একা হয়ে গেলেন

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: তখন সিপিএম-পরিচালিত বামফ্রন্ট আমল৷ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজেপি সভা করেছিল৷ বিজেপি-র সর্বভারতীয় নেতৃত্ব সেখানে বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন৷ রাজ্য বিজেপি-র শীর্ষে সেই সময় তপন শিকদার, পরশ দত্ত প্রমুখ৷ বিজেপি তখনও দেশের ক্ষমতায় আসেনি৷ আসবে যে সে রকম কোনও সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না৷ তবে রাম মন্দির তখনই তাদের প্রধান এজেন্ডা৷ প্যাটন ট্যাঙ্কের কাছে বসে-দাঁড়িয়ে গোটা সভাটা দেখেছিলাম, সবার বক্তৃতাও শুনেছিলাম৷

মুখতার আব্বাস নাকভি তখনও ওঠেননি৷ তাঁর জায়গায় ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বভারতীয় নেতৃত্বে মুসলিম সংখ্যালঘু প্রতিনিধি ছিলেন সিকন্দর বখত৷ তিনি এবং মুরলিমনোহর যোশির মতো বক্তারা মঞ্চে ওঠার পর লাস্ট বাটোয়ান হিসাবে বলতে উঠলেন লালকৃষ্ণ আদবানি৷ শেষ বক্তা ছিলেন অটলবিহারি বাজপেয়ি৷ উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল হাতে গোনা৷ বেশিরভাগই ছিলেন অবাঙালি শ্রোতা৷

পড়ুন: বাজপেয়ী আর মিসেস কাউলের সম্পর্ক চিরকাল রহস্যেই থেকে গেল

- Advertisement -

পরবর্তীকালে অটলবিহারি বাজপেয়ি এবং লালকৃষ্ণ আদবানির বন্ধূত্বের কথা জেনেছি৷ কৈশোর-উত্তীর্ণ সময় থেকেই তাঁরা পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন৷ একসঙ্গে জনসঙ্ঘী রাজনীতির আঙিনায় পদার্পণ থেকে সিনেমা দেখা, গোলগাপ্পা-ভেলপুরি খাওয়া সবেতেই ছিলেন পরস্পরের সঙ্গী৷

বন্ধুত্বের দিক থেকে বিচার করলে বাংলার বামপন্থী রাজনীতিতে একই রকম বন্ধন ছিল সরোজ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরির৷ ছাত্রাবস্থায় বাপুজির নেতৃত্বে সত্যাগ্রহী আন্দোলন শুরু করে পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যেভাবে দুই বন্ধু পরস্পরের হরিহর আত্মা ছিলেন ঠিক একই রকম বন্ধুত্ব ছিল লালকৃষ্ণ আদবানির সঙ্গে অটলবিহারি বাজপেয়ির৷

যদিও রাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে দুই বন্ধুর অবস্থান সব সময় একই রেখায় থাকেনি৷ লালকৃষ্ণ আদবানি ছিলেন জ্বালাময়ী বক্তৃতার জন্য প্রসিদ্ধ, অটলবিহারি বাজপেয়ি ছিলেন মেপেজুপে বলার মানুষ৷ পরবর্তীকালে বিজেপি-পরিচালিত এনডিএ আমলে বাজপেয়িকে তুলে ধরা হয়েছিল বিকাশ পুরুষ হিসাবে, আর আদবানি ছিলেন লৌহপুরুষ৷

পড়ুন: বন্ধু বাজপেয়ীকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ আডবাণী

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়৷ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় লালকৃষ্ণ আদবানিকে যতখানি উল্লসিত দেখা গিয়েছিল, বাজপেয়ি কিন্তু ঠিক ততটাই সংযত ছিলেন৷ এটা অবশ্য অনেক পরের কথা৷ তার আগে ১৯৮৩ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর যে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল সেই ঝড়ে বহুগুণা, আদবানি-র মতো মহারথীও উড়ে গিয়েছিলেন৷ ১৯৮৪ সালের সেই ভোটে মাত্র দুটি আসন জুটেছিল বিজেপি-র৷ দুঃখের বিষয়, সেই নির্বাচনেই নকশাল নেতা সন্তোষ রানা-র গোষ্ঠীর সঙ্গে বিজেপি-র আসন সমঝোতা হয়েছিল৷

দল হিসাবে বিজেপি-র উত্থান-পতনের বহু ঘটনার সাক্ষী ছিলেন দুই বন্ধু৷ জনতা পার্টির আমলে বাজপেয়ি বিদেশমন্ত্রী হয়েছিলেন৷ ইন্দিরা গান্ধীকে হারানোর জন্য মোরারজি দেশাইদের সঙ্গে তাঁদের এক জায়গায় জড়ো করেছিলেন গান্ধীবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ৷ দিল্লির মসনদে বসতে না বসতে অবশ্য তাঁকেই ভুলে গিয়ে ইন্দিরা-বিরোধীরা চুলোচুলি শুরু করে দেন৷

পরবর্তীকালে জনতা পার্টি থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৃথক ভারতীয় জনতা পার্টির সৃষ্টি হয়৷ ভোটে পদ্মফুল প্রতীকের আগমন ঘটে৷ বিজেপি-পরিচালিত প্রথম এনডিএ আমলে ‘ফিল গুড’ আর ‘বিজলি-সড়ক-পানি’ দিয়ে বাজপেয়ির জয়যাত্রা এগতে থাকলেও তাঁর দলের অভ্যন্তরেই নানা কারণে অসন্তোষ দেখা দিতে শুরু করে৷ বাজপেয়ির আমলে লালকৃষ্ণ আদবানি ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী৷ ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা হলেও মানসিকতার দিক থেকে অটলবিহারি বাজপেয়ি ছিলেন ইউরোপিয়ান ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট নেতাদের মতো৷

পড়ুন: গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ থেকেই যাত্রা শুরু বাজপেয়ীর!

রাজনৈতিক কারণে হিন্দুত্বের কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে তিনি জওহরলাল নেহরুর ভক্ত এবং সেক্যুলারিজমেরই সমর্থক ছিলেন৷ গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী তথা হাড়েমজ্জায় বানিয়ারা তা মানে কী করে? তারা তো টিকি রাখা এবং পৈতে ধারণের মধ্যেও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য খোঁজে! অতএব বাজপেয়ির আমল পুরো পাঁচ বছরও টিঁকল না৷ তার আগেই পরবর্তী ভোটে জেতার আশায় নির্বাচন ঘোষণা করা হল৷ ভোটের ফলাফলে দেখা গেল, ভারতের অধিকাংশ ভোটারের ততটা ‘গুড ফিলিংস’ ছিল না৷ তারা উলটো দিকে ভোট দিয়েছেন৷ যে কোনও সুস্থ গণতন্ত্রের এটাই দস্তুর৷ ভোটাররাই শেষ কথা বলেন৷ ইভেন্ট ম্যানেজার কিংবা মিডিয়া ম্যানেজাররা বলেন না৷ রাঁড়েরাও বলে না৷

তবু, বিজেপি-র দীর্ঘ রাজনৈতিক উপাখ্যানে অটলবিহারি বাজপেয়ি এবং লালকৃষ্ণ আদবানির বন্ধুত্ব একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে রয়ে যাবে৷ তাঁরা তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক লাইনে থেকেছিলেন৷ পারস্পরিক মতবিরোধ অবশ্যই ছিল৷ কিন্তু ব্যক্তিগত বৃত্তে এক বন্ধু আর এক বন্ধুকে কখনই পরিত্যাগ করেননি৷ দুজনের একজন চলে গেলেন৷ আর একজন একা হয়ে গেলেন৷

Advertisement
----
-----