কাবুলঃ   কট্টরপন্থিদের চোখ রাঙানি আর জঙ্গিদের বন্দুকের নল উপেক্ষা করে আফগানিস্তানের মেয়েরা খেলার মাঠে নামলেও সেখানে যৌন নিপীড়ন তাদের স্বপ্নকে পরিণত করেছে দুঃস্বপ্নে। তালেবান শাসনকালের পর আফগানিস্তানের জাতীয় মহিলা ফুটবল দল দেশটিতে মহিলা স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও দারুণ ভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন তারা। অথচ সেই মহিলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা খেলতে এসে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এমনটাই বলে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি করেছেন দেশেরই এই শীর্ষ সরকারি আধিকারিক। শুধু ফুটবলেই নয়, দেশে সব খেলার ক্ষেত্রেই এই সমস্যা হচ্ছে বলে তাঁর।

বেশিরভাগ সময়ে দলের কোচ বা ক্রীড়া আধিকারিকরদের হাতে মহিলা খেলোয়াড়রা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। যে কারণে তারা নিপীড়ন নিয়ে মুখ খুলতে ভয় পায় বলেও জানান ওই আধিকারিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি কয়েকজন মহিলা খেলোয়াড় বিবিসি’র কাছে নিজেদের ভয়ঙ্কর ওই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গত কয়েকদিন ধরে আফগানিস্তানে জাতীয় মহিলা ফুটবলারদের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার একের পর এক ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে। এর জেরে গত শুক্রবার বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।

ফিফার ঘোষণার পর আফগান অ্যাটোর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকেও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীন তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সোমবার আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি এই ঘটনা ‘পুরো আফগানিস্তানকে হতবাক’ করেছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “এমনকি যদি এই অভিযোগ নিছকও হয়, তারপরও আমাদের জনগণ তাদের ছেলেমেয়েদের খেলার মাঠে পাঠানো বন্ধ করে দিতে পারে। এর বিরুদ্ধে আমাদের দ্রুত এবং বিস্তারিত পরিসরে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।”

যে সমস্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগ উঠেছে তাদের মধ্যে আফগান ফুটবল ফেডারেশনের (এএফএফ) প্রেসিডেন্ট কেরামুদ্দিন করিম এবং মহাসচিব সৈয়দ আলিরেজা আকাজাদাও রয়েছেন। যদিও তারা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আলিরেজার দাবি, মহিলারা যেসব অভিযোগ করেছেন সেগুলো ‘সত্য নয়’।

বিবিসি জানায়, সোমবার আফগান পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। এরপর দেশটির অলিম্পিক কমিটির প্রধান হাফিজুল্লাহ রাহিমি রাজধানী কাবুলে সাংবাদিকদের সামনে এক বিবৃতিতে জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, “দুঃখজনকভাবে, আমাদের কাছে এই ধরনের কিছু অভিযোগ এসেছে। যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে এবং শুধু ফুটবল ফেডারেশনেই নয় অন্যান্য খেলার ফেডারেশনেও নিপীড়ন হয়েছে। আমাদেরকে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।”

খালিদা পোপাল নামে আফগান নারী ফুটবল দলের একজন প্রাক্তন অধিনায়ক প্রথম যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। যিনি অবসরের পর মহিলা ফুটবল দলের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিশোরী খালিদা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যখন লুকিয়ে ফুটবল খেলার অনুশীলন করতেন তখন আফগানিস্তানে তালেবান শাসন চলছে। স্কুলের মাঠে খালিদা ও তার বান্ধবীরা মুখ পুরো বন্ধ রেখে ফুটবল খেলত যাতে সীমানা প্রাচীরের বাইরে পাহারায় থাকা তালেবান রক্ষীরা কিছু টের না পায়।

হত্যার হুমকি পাওয়ার পর ২০১১ সালে থেকে খালিদা ডেনমার্ক চলে যান এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। ডেনমার্ক থেকে খালিদা বিবিসি’কে বলেন, তিনি নিজে কোচ ও ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের কাছে কিশোরী ও তরুণীদের শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হতে দেখেছেন।তিনি বলেন, “মেয়েরা আমার কাছে ধর্ষণ থেকে শুরু করে শরীরে অনাকাঙ্খিত স্পর্শ এবং হেনেস্থার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছে।

“আমি দলের দুই কোচের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের যৌন নিপীড়নের তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা শুরু করি। কিন্তু তাদের শাস্তি হওয়ার আশা আমি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমি আফগান ফুটবল ফেডাশনের কাছে কয়েক বছর আগেই ওইসব তথ্য প্রমাণ নিয়ে গেছি। কিন্তু তারা অভিযুক্তদের সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের পদোন্নতি দিয়েছে।” যৌন নিপীড়নকারী কয়েকজন অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং তাদের সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ আছে বলেও জানান তিনি। এমনকি কর্মকর্তারা খেলোয়াড়দের তাদের সঙ্গে সহবাসের বিনিময়ে দলে সুযোগ দেওয়া ও অর্থ দেওয়ার লোভ দেখাত বলেন জানান খালিদা।

----
--