মমতার পর যোগী সরকার: প্রকাশ্যে ঘুষ খাওয়ার সরকারী নির্দেশ ?

মানব গুহ, কলকাতা: বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর এবার উত্তরপ্রদেশে যোগী সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য৷ সীমার মধ্য থেকে ‘টাকা কামাবার’ পরামর্শ দিয়ে সাধারণ মানুষের বিস্ময় ও কৌতুকের খোরাক হলেন উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্য়মন্ত্রী ও PWD দফতরের মন্ত্রী৷ আর প্রকাশ্যে নিয়ম মেনে ঘুষ খাবার সরকারী নির্দেশ শুনে ফের হতবাক দেশের রাজনৈতিক মহল থেকে আমজনতা৷

নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক, ঠিকাদারদের ঘুষ খাবার ঘটনা, কাজ না করে টাকা কামাবার ঘটনা ভারতে আর নতুন নয়৷ সবাই জানেন, সবাই বোঝেন, শুধু ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করেন না৷ কিন্তু ঘুষ খাবার আর ঘুষ দেবার ঘটনা এখন এতটাই সহজ, সরল ও সোজা হয়েছে যে নেতা মন্ত্রীরাও এখন মেপে ঘুষ খাবার কথা বলেন, তাও আবার প্রকাশ্যে৷

তারকেশ্বরে হূগলি জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতাদের কাটমানি খাবার গল্প প্রকাশ্যে এনেছিলেন৷ সবার সামনে, সবাইকে হতবাক করে চুঁচুড়ার বিধায়ক অসিত মজুমদারকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘শুধু কাটমানি ও কমিশন খাওয়ার ধান্দাবাজি! চ্যাংড়ামো হচ্ছে! স্টেডিয়াম তৈরির কাজ থেকে কত টাকা খাওয়া হয়েছে? একটা স্টেডিয়াম করতে কত টাকা লাগে? কোনও কাটমানি খাওয়া চলবে না৷ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সব একা খাবে, তাই না!’ ওই সময়ই মুখ্যমন্ত্রী পরামর্শও দেন, একা সব না খেয়ে ভাগ করে খেতে৷

- Advertisement -

রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য ছিল, দলের নেতা-কর্মীদের একটা অংশ যে এখন রীতিমতো কাটমানি ও কমিশন খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, তা নিয়ে ঘনিষ্ঠমহলে বারবার চরম অসন্তোষ ব্যক্ত করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়৷ তারই বহিঃপ্রকাশ হয় হুগলির প্রশাসনিক বৈঠকে৷

এবার, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পর উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকার৷ সব সরকারই যে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ তা আরেকবার প্রমাণ হয়ে গেল আজ৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর এক সুর এবার যোগী সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্যের গলায়৷ ঘুষ নেওয়ার খেলা কোন চরম পর্যায়ে গেছে তা প্রকাশ্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী৷ এবার উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য সেই প্রমাণে শিলমোহর লাগালেন৷

উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী ও PWD মন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য সোমবার বলেন, ‘খাবারে যতটা নুন দিলে সুস্বাদু লাগে ততটাই টাকা কামান৷’ তিনিও যে ‘টাকা কামান’ বলতে ঠিকাদারদের অন্যায় ভাবে উপার্জনের কথাই বলেছেন তা বুঝতে অসুবিধা হয় নি কারোরই৷ ঠিকাদারদের তিনি বলেন, ‘টাকা লুঠ করবেন না৷ টাকা কামান, তবে খাবারে যতটা নুন লাগে ততটাই কামান’৷

ঠিকাদারদের অন্যায় কাজের শাস্তিদানের কথা বলার বদলে তিনি ঠিকাদারদের টাকা কামাবার অনুমতি দিলেন প্রকাশ্যে৷ আর কে না জানে, ঠিকাদারদের টিকি বাধা থাকে নেতাদেরই হাতে৷ নেতাদের ঘুষ না দিয়ে কোন ঠিকেদার কাজ করতে পারেন না বলেই অভিযোগ করেন ঠিকাদাররা৷ প্রকাশ্যে টাকা কামাবার কথা বলে ঠিকাদারদের খারাপ কাজ করে টাকা মারার অনুমতি দিলেন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল থেকে আমজনতা৷

২০১২ সালে এই উত্তরপ্রদেশ মন্ত্রীসভার সমাজবাদী দলের মন্ত্রী শিবপাল যাদব প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘পরিশ্রম করে কাজ শেষ করলে তুমি কিছুটা চুরি করতে পারো’৷

সাধারণ মানুষ বিস্ময়ে অবাক হয়ে যান এই সমস্ত কথা শুনে৷ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রীরা ঘুষ খাওয়া বন্ধ করার বদলে ঘুষ নিতে বলছেন৷ ভালো করে কাজ করার বদলে টাকা কামাবার কথা বলছেন৷ সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ৷ একজন মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘একা কাটমানি খেয় না,ভাগ করে খাও৷’ তো অন্যজন বলছেন ‘খাবার সুস্বাদু করতে যতটা নুন লাগে ততটাই টাকা কামান’৷ ঘুষ খাওয়া বন্ধ করতে, খারাপ কাজ করে টাকা কামাবার বিরুদ্ধে কড়া শাস্তি ঘোষণার বদলে প্রকাশ্য়ে ঘুষ খাবার, টাকা কামাবার নিয়ম বলে দিচ্ছেন রাজ্যের সর্বময় নেতা নেত্রীরা !!

প্রকাশ্যে ঘুষ খাবার পরামর্শ দিচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরাই৷ ঘুষ খান, বুঝে শুনে, ভাগ বাটোয়ারা করে৷ ঘুষ খান, সবাই মিলে৷ সত্যি কি দিন এল৷ প্রকাশ্যে নেতা মন্ত্রীরা ঘুষ খাবার পরামর্শ দিচ্ছেন৷ কাটমানি আর ঘুষ খাওয়াটাও এখন নিয়মের মধ্যেই পড়ে৷ কেউ যাতে সবটাই একা খেয়ে না নেয় তার জন্যই মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে ঘুষ খাওয়া নিয়ে নিজের মতামত দিতে হয় রাজ্য়ের মুখ্যমন্ত্রী-উপমুখ্যমন্ত্রীদের৷ ভারতের রাজনৈতিক অবস্থাটা ঠিক কোথায়, তা বোঝাই যায়৷ আর আমজনতার হাল কি, সেটাও দিনের আলোর মত পরিস্কার৷

Advertisement
---