তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: বাঁকুড়ার জঙ্গল মহলের অন্যতম বনজ সম্পদ মহুল৷ স্থানীয়রা ‘মোল’ বলেই জানেন৷ এই মহুল সংগ্রহ করে এই জেলার রাণীবাঁধ, রাইপুর, সারেঙ্গা, সোনামুখীর কয়েকশো পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবনধারণ করেন৷ বসন্তের এই পাতা ঝরা মরশুমে কেমন আছেন মহুল সংগ্রহকারী প্রান্তিক মানুষ গুলি? তারই সুলুক সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলাম বাঁকুড়ার জঙ্গল মহলের প্রত্যন্ত গ্রাম গুলিতে৷

বৃহস্পতিবার সাতসকালে সোনামুখীর জঙ্গলঘেরা মাচাডোবা এলাকায় দেখা পাওয়া গেল অরুণ ও মঞ্জুলা রায়ের৷ সঙ্গে একটা ঝুড়ি নিয়ে মহুয়া গাছের তলায় এক মনে মহুল ফুল সংগ্রহে ব্যস্ত৷ কথা প্রসঙ্গে অরুণ আর মঞ্জুলা জানালেন, একশো দিনের কাজও সেভাবে হচ্ছেনা৷ আর্থিক উপার্জনের রাস্তাও প্রায় বন্ধ৷ এই মরশুমে প্রায় দেড় মাস তাঁরা মহুল সংগ্রহের কাজই করেন৷ এর থেকে তাঁরা বাইরে আসা পাইকারি খদ্দেরকে মহুল বিক্রি করে কিছু উপার্জন করেন৷

Advertisement

তাছাড়া অনেক সময় বাড়িতেও খাবার হিসেবেও ব্যবহার হয় সংগৃহীত এই মহুল৷ কিন্তু চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্যে কমছে মহুল গাছের সংখ্যা৷ আর একই সঙ্গে জঙ্গলে আগুন লাগানোর প্রবণতা ইদানীং কালে যেভাবে বেড়েছে তাতে আর কতদিন খাদ্যরসিক বাঙালি প্রকৃতির এই অকৃপণ দান ‘মহুল’র স্বাদ পাবেন তা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিয়েছে৷

উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বৃহদাকারের এই মহুল বৃক্ষ sapotaceae পরিবারভূক্ত৷ সাধারণত এই গাছ ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে৷ সাধারণত হলুদাভ এই ফুলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, খনিজ দ্রব্য, ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম রয়েছে৷ গ্রামীণ বাংলায় সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ধরণের সুস্বাদু খাবার তৈরির পাশাপাশি গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবেও এই মহুলের ব্যাপক ভাবে ব্যবহার দেখা যায়৷ এছাড়াও এর ঔষধিগুণও নেহাত কম নয়৷ মহুয়া তেলের প্রলেপ বিভিন্ন ধরণের চামড়ার রোগ, বাত, মাথা ব্যথা সহ বিভিন্ন রোগের মহৌষধি হিসেবে খুব কাজ করে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন৷

বাঁকুড়ার জঙ্গল মহলে বেশ কয়েক বছর ধরে দলমার দামালদের ধারাবাহিক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে৷ তাদের আক্রমণে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত৷ সাম্প্রতিক সময়ে ‘গোদের উপর বিষ ফোঁড়া’ হিসেবে দেখা দিয়েছে বাঘাতঙ্ক৷ বনদফতরের পক্ষ থেকে বাঁকুড়ার জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতি ও অস্তিত্বের প্রমাণ না মেলার কথা ঘোষণা করা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছেনা৷

তার মধ্যেও সেই ‘আতঙ্ক’কে সঙ্গী করে প্রতিদিন মহুল সংগ্রহে জঙ্গলের গভীর থেকে আরও গভীরে প্রবেশ করতে হয় অরুণ, মঞ্জুলাদের মতো দিন আনি দিন খাই মানুষদের৷ কারণ গাছ থেকে প্রকৃতির নিয়মে ঝরে পড়া মহুয়া প্রতিদিন সংগ্রহ না করতে পারলে গাছের নিচে পচে নষ্ট হয়ে যাবে এই ফুল৷ টান পড়বে দৈনন্দিন সংসার পরিচালনার খরচে৷ সারা বছরের মধ্যে বসন্তের এই প্রায় দু’মাসের বাড়তি রোজগারও যে ঘরে তোলা যাবেনা৷ অগত্যা ভয় আর আতঙ্ককে হেলায় হারিয়ে প্রতিদিন কাকভোরে জঙ্গলে পৌঁছতেই হয় এই মানুষ গুলিকে৷

কিন্তু এত সবের পরেও মন ভালো নেই জঙ্গল মহলবাসীর৷ রাজ্যের বাইরে এই মহুলের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও সারাদিন পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার পরও এরা ন্যায্য দাম পাননা৷ গড়ে কুড়ি থেকে পঁচিশ টাকা দরে বিক্রি করাটাই অনেক সময় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে৷ গত বছর যে দাম পাওয়া গিয়েছিল এবছর সেই দামটাও মিলবে কিনা তা নিয়েই চিন্তায় দিন কাটছে জঙ্গল মহলের মহুল সংগ্রহকারীদের৷ তাদের দাবি, সরকার কেন্দু পাতা সহ অন্যান্য বনজ সম্পদের যেভাবে ‘নির্ধারিত মূল্য’ ঠিক করেছেন, সেইভাবে মহুলের ক্ষেত্রেও যদি একই পন্থা অবলম্বন করেন তাহলে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখতে পাবেন এই মানুষগুলি৷

----
--