সংবাদ ব্যুরো: বামেদের জেল ভরো কর্মসূচি ঘিরে উত্তরবঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে৷ ভাঙচুর, পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে একাধিক জায়গায়৷ অভিযোগ, বালুরঘাটে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সরকারি অফিসের ভিতরে ঢুকে ভাঙচুর চালান আন্দোলনকারীরা৷ ভাঙচুর চালাতে গিয়ে জখম হন কয়েকজন আন্দোলনকারী। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের ছোড়া পাথরের আঘাতে জখম হন বালুরঘাট থানার আইসি সঞ্জয় ঘোষ৷

আরও পড়ুন: বামেদের আইন অমান্য, দক্ষিণবঙ্গে যানজটে নাকাল যাত্রীরা

Advertisement

এই ঘটনা ঘিরে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় বালুরঘাট জেলা প্রশাসনিক ভবনচত্বর ও সংলগ্ন এলাকা৷ অভিযোগ, আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইঁট, পাথর ছোঁড়ে৷ জখম হন বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মী ও সিভিক ভলান্টিয়ার৷ সরকারি অফিসের সম্পত্তি ভাঙচুর ও পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে ৫০জনের বেশি গ্রেফতার হন৷

অভিযোগ, বাম নেতা তথা প্রাক্তনমন্ত্রী নারায়ণ বিশ্বাসের নেতৃত্বে কয়েকশো আন্দোলনকারী বালুরঘাটে পুলিশের ব্যারিকেড সরিয়ে জেলা প্রশাসনিক ভবন চত্বরে ঢুকে পড়েন। পুলিশের নজর এড়িয়ে তাঁরা পিছন গেট দিয়ে প্রশাসনিক ভবনের ভিতরে ঢুকে শুরু করে ভাঙচুর৷ আন্দোলনকারীরা ট্রেজারি অফিসের দরজা ও ভিতরের কাঁচ, আসবাবপত্রও ভাঙচুর করেন।

ভাঙচুর শেষে প্রশাসনিকভবন চত্বরের বাইরে এসে মেইন রোডে অবরোধে বসেন তাঁরা৷ বিকেল চারটে নাগাদ বালুরঘাট থানার আইসি সঞ্জয় ঘোষ মাইকিং করে অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানাতে আসেন৷ অভিযোগ, সেই সময় নারায়ণ বিশ্বাস ঘোষণা করেন, যতক্ষণ না পুলিশ গ্রেফতার করছে ততক্ষণ তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন৷

এই ঘোষণার পরই আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ ও ধাক্কাধাক্কি শুরু করে বলে অভিযোগ৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি। বালুরঘাট হাইস্কুল মাঠ থেকে আন্দোলনকারীরা ইঁট পাথর ছুড়লে কয়েকজন পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার জখম হন৷ জখম এক সিভিক ভলান্টিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন৷

আরও পড়ুন: যাদবপুরে ভরতি প্রক্রিয়ার জট কাটাতে আসরে উপাচার্য

প্রাক্তনমন্ত্রী নারায়ণ বিশ্বাস জানান, তাঁদের জেল ভরো আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল। প্রশাসনিক ভবনের ভিতরে ভাঙচুরের ঘটনায় আন্দোলনকারীদের কেউ জড়িত নন। পুলিশই অন্যায়ভাবে লাঠি চার্জ ও গ্রেফতার করে তাঁদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বানচালের চেষ্টা করলেও তা সর্বতোভাবে সফল হয়েছে৷

জেলা পুলিশসুপার প্রসূণ বন্দোপাধ্যায় অবশ্য জানিয়েছেন সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও পুলিশের উপর হামলা চালানোর ঘটনায় সন্ধ্যে পর্যন্ত মোট তিরিশজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আরও বেশ কয়েকজনের খোঁজে তল্লাশি চলছে বলেও পুলিশ সুপার জানিয়েছেন।

অন্যদিকে কোচবিহারে জেল ভরো কর্মসূচি ঘিরে টানটান উত্তেজনা ছিল কোচবিহার জেলাশাসক দফতরের সামনে৷ সকাল থেকেই বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন ছিল সেখানে৷ তৈরি করা হয়েছিল চারটি ব্যারিকেড৷ দুপুর দু’টো নাগাদ প্রায় দু’হাজার মানুষের মিছিল এসে সেই ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে৷

এই নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধস্তাধস্তি হয় বাম নেতাদের। কৃষকসভার জেলা সভাপতি তমসের আলি, সিপিএম নেতা তারিণী রায় ভিড়ের মধ্যে পড়ে যান। সামান্য চোটও পান তাঁরা। একইভাবে চোট লাগে কয়েকজন পুলিশ কর্মীর৷

এদিন জেল ভরো কর্মসূচির জন্য চারটি বাস এনেছিল পুলিশ। কিন্তু তাতে জায়গা কম থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় সিপিএমের তরফে৷ সিপিএম নেতা তমসের আলি বলেন, দেশজুড়ে জেল ভরো আন্দোলন কোচবিহারে সফল হয়েছে৷ হাজার হাজার কৃষক এদিন গ্রেফতার হয়েছেন।

জলপাইগুড়িতেও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে চলে মিছিল৷ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, মালবাজার, ক্রান্তি, মেটেলি, নাগরাকাটা, রাজগঞ্জ-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে দলে দলে গরিব কৃষক ও খেতমজুররা জলপাইগুড়ির দিকে হাঁটা লাগান৷

শহরের সমাজপাড়ায় জড়ো হন তাঁরা। এদিকে তৃণমূলও ওই একই জায়গায় বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালনের কর্মসূচি নেয়। কিন্তু বামেদের দাবি, তারা আগেই এই জায়গায় কর্মসূচির কথা পুলিশকে জানিয়েছিল৷ তারপরও কীভাবে তৃণমূল অনুমতি পেল তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলে৷

এদিন সমাজপাড়া থেকে মিছিল করে মার্চেন্ট রোড, থানা মোড়, বাবুপাড়া হয়ে মিছিল এগিয়ে চলে জেলা শাসকের দফতরের দিকে। পুলিশসুপারের দফতর পাড় হতেই পুলিশ তাদের বাধা দিতে আসে বলে অভিযোগ৷ বেশ কয়েকটি লোহার ব্যারিকেড দিয়েও এদিন পুলিশ আটকে রাখতে পারেনি আন্দোলনকারীদের।

অভিযোগ, এরপরই পুলিশের লাঠি পিঠের উপর পড়ে আন্দোলনকারীদের৷ কিন্তু পিছু হঠেননি তাঁরা৷ ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যান৷ জলপাইগুড়ি কোতয়ালী থানার আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার মাইক হাতে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হল বলে ঘোষণা করেন। কিন্ত পুলিশ ভ্যানের সংখ্যা মাত্র পাঁচটি। এই পাঁচটি পুলিশ ভ্যানে কীভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক ও খেতমজুরদের থানায় নিয়ে যাওয়া হবে তা নিয়ে সংশয়ে পড়ে পুলিশ।

এরপর বেশ কয়েকবারে এই ভ্যানেই মহিলা ও পুরুষ আন্দোলনকারীদের থানায় নিয়ে আসা হয়৷ সারা ভারত কৃষক সভার জলপাইগুড়ি জেলাসম্পাদক আশিস সরকার বলেন, ২০১১ সালের পর তিস্তা সেচ প্রকল্পের কাজ স্তব্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। বাঁ হাতি খাল খনন করার কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে মালবাজার, ক্রান্তি, ময়নাগুড়ি সহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার গরিব কৃষকেরা সেচের জল পাচ্ছেন না। অবিলম্বে এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে৷

----
--