কলকাতা সফরের মাঝেই কুর্সি গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের এই বাঙালি প্রধানমন্ত্রীর

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: ভবিতব্য বলবেন বা নিয়তির খেল যাই বলুন, পাকিস্তানের কুর্সিতে কোনও প্রধানমন্ত্রী টানা পাঁচ বছর টিকতে পারেননি৷ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই শুধু আসা আর যাওয়া…

সদ্য ক্ষমতা হারানো নওয়াজ শরিফ সেই ধারার নবতম সংযোজন৷ যদিও আরও তিনবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন কিন্তু পূর্ণ সময় ক্ষমতায় থাকতে পারেননি৷

স্বাধীনতার পর থেকেই তীব্র সামরিক শাসন দমবন্ধ হয়েছে পাকিস্তান৷ কুর্সি নিয়ে দড়ি টানাটানিতে রথী মহারথীরা এসেছেন গিয়েছেন৷ সামরিক শাসন জারি হয়েছে৷ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ার সুবাদে সেই রেশ ছড়িয়েছে ভারতে৷

যেমন অতিপরিচিত নেতা এ কে ফজলুল হক সাহেবকে ঘিরেও পাকিস্তানের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়েছিল৷ অবিভক্ত ভারতের এই সুপরিচিত বাঙালি কৃষক নেতা হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী৷ আর পাক রাজনীতির ভবিতব্য মেনেই তাঁর কুর্সি আচমকা চলে গিয়েছিল৷

হক সাহেবের দুর্ভাগ্য, যে শহরটি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় সেই কলকাতা সফরে এসেই প্রধানমন্ত্রীর তকমা হারানোর খবর শুনেছিলেন৷ বাঘা রাজনীতিক৷ তাই দমে না গিয়ে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাক রাজনীতিতে৷ তাঁর নেতৃত্বে পরপর গণআন্দোলনে ফুঁসে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তান৷

এ কে ফজলুল হকের পুরো নাম আবুল কাশেম ফজলুল হক ৷ তিনি পরিচিত ছিলেন ‘শের এ বাংলা’ নামে৷ সাধারণের কাছে তিনি ‘হক সাহেব’৷ ১৮৭১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি আইন পাশ করেন তিনি৷

পরে জড়িয়ে পড়েন কৃষক রাজনীতিতে৷ অবিভক্ত ভারতের পূর্ববাংলা অঞ্চলে তাঁর প্রবল প্রতিপত্তি তৈরি হয়৷ সেই সুবাদে প্রথমে কংগ্রেস ও পরে মুসলিম লিগের রাজনীতিতে অংশ নেন৷ এরপর কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন৷ বিশিষ্ট এই কৃষক রাজনীতিবিদ ১৯৩৫ সালে ছিলেন কলকাতার মেয়র৷ পরে অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭ – ১৯৪৩) হন৷

দেশভাগের পর পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন ফজলুল হক সাহেব৷ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পাক সরকার গুলি চালায়৷ তার জেরে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবল সরকার বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়৷ এই পরিস্থিতিতে ফজলুল হক ও আরও দুই প্রখ্যাত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (সুরাবর্দী) ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। পূর্ব পাকিস্তানে সেই জোট ক্ষমতায় আসে৷ ১৯৫৪ সালে এ কে ফজলু হক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷

ক্ষমতায় আসার পরই কলকাতা সফরে এসেছিলেন হক সাহেব৷ ঠিক এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল তাঁর বিরোধী গোষ্ঠী৷ মাত্র একমাসের মাথায় হল পট পরিবর্তন৷ ১৯৫৪ সালের ৩১ মে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মহম্মদ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রী পরিষদ বাতিল করেন৷ পূর্ব পাকিস্তান জারি হয় গভর্নর শাসন৷ কলকাতা সফরের মাঝেই কুর্সি চলে গিয়েছে জানতে পেরেছিলেন শের এ বাংলা ফজলুল হক৷

হাল ছাড়েননি হক সাহেব৷ কূটনীতির চালে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েছিলেন৷ ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন৷ ১৯৫৮ সালে পাক সরকার হক সাহেবকে গভর্নরের পদ থেকে অপসারিত করে। রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেন ফজলুল হক৷ ১৯৬২ সালে প্রয়াণ হয় তাঁর৷

Advertisement
----
-----