মুলায়মের ‘আখাড়া’র এই দশার জন্য কি অমর সিং-ই দায়ী?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবের ‘আখাড়া’য় মুষলপর্ব জমে উঠেছে৷ সমাজবাদী পার্টি কার্যত খাড়াখাড়ি দুভাগ৷ একদিকে অখিলেশ-রামগোপাল, অন্যদিকে অমর সিং-শিবপাল৷ মুলায়ম সিং যাদবের দুই বউ৷ বাস্তবিক এক-এক জনের ভাগে পড়েছে এক-একটা অংশ৷ সকলের কাছেই পার্টি সুপ্রিমো মুলায়ম সিং যাদবই ‘শেষ কথা’৷ কিন্তু একটা সময় জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘তরুণ তুর্কি’ মুলায়ম সিং যাদবের অবস্থা এখন অনেকটা বুড়ো মুরগির মতো৷ একে বয়স হয়েছে, তায় উত্তরপ্রদেশের

নিখিলেশ রায়চৌধুরী
নিখিলেশ রায়চৌধুরী

ক্ষমতার পাশাপাশি দলের বাহুবলীরাও বেশিরভাগই অখিলেশের দিকে ঢলেছে৷ যে ক্ষমতায় থাকে, পুলিশ এবং বাহুবলী উভয়েই তাকে তোয়াজ করে চলে৷ একদল করে চাকরি বাঁচানোর তাগিদে, আর একদল করে করেকম্মে খাওয়া এবং টিঁকে থাকার স্বার্থে৷ তাই মুলায়মের এখন কিছু বলারও নেই, করারও নেই৷ দুই বউয়ের চুলোচুলিতে যে জিতবে তার পক্ষই তাঁকে নিতে হবে৷ আপাতত তিনি ৫ জানুয়ারি দলের নেতৃত্বের বৈঠক ডেকেছেন৷ সেখানে কী হবে কিংবা তার আগেই মুষলপর্ব আরও সাঙ্ঘাতিক আকার নেবে কি না, সেটাই এখন লখনউ সহ প্রায় গোটা দেশেই বড় চর্চার বিষয়৷

একটা সময় শিক্ষিত বাঙালি লখনউ বলতে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বুঝত৷ সেখানকার জাতিধর্মনির্বিশেষে সমস্ত কলেজ-ইউনিভার্সিটি পড়ুয়ার কাছে যিনি ডিপি বলেই পরিচিত ছিলেন৷ ধূর্জটিপ্রসাদ ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত এবং সেইসঙ্গে উন্নাসিক৷ তবে সেই উন্নাসিকতা তাঁকেই শোভা পেত৷ এখনও যদি তিনি বেঁচে থাকতেন এবং গোমতীপারেই কাটাতেন, তাহলে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির বর্তমান অবস্থা দেখে তিনি কী বলতেন তা তিনিই জানেন৷ তবে, নিজের সময়েই কাউকে ছেড়ে কথা বলার অভ্যাস যাঁর ছিল না তিনি এখনকার অবস্থা দেখে হয়তো বলেই বসতেন—পলিটিক্স আর হোর-হাউসের মধ্যে কোনও ফারাক নেই৷
সমাজবাদী পার্টির কুঁদোকুঁদি দেখে কেবল একজনের নামই ঘুরেফিরে মনে আসছে৷ তিনি হলেন অমর সিং৷ অমর সিং হচ্ছেন পাক্কা অপারেটর, পলিটিক্যাল টাউট৷  এক সময় এই কলকাতায় সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের অনুগামী ছিলেন৷ কংগ্রেস নেতা হিসাবে সুব্রত মুখোপাধ্যায় তখন জোড়াবাগান বিধানসভা কেন্দ্র থেকে দাঁড়াতেন৷ অমর সিং ছিলেন তাঁর আইএনটিইউসি করনেওয়ালা চ্যালা৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখলেন, পোস্তার পোস্ত খেয়ে এবং খাইয়েও এ রাজ্যের রাজনীতিতে বেশিদূর এগনো যাবে না৷ অতঃপর ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দিলেন উত্তর প্রদেশে৷ অমর সিংয়ের মতো একজন অপারেটরই মুলায়ম সিং যাদবের দরকার ছিল৷ অতঃপর অমর সিংকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি৷ কোথায় কোথায় না হাত বাড়িয়েছিলেন তিনি! মায় অমিতাভ বচ্চনের পরিবারে পর্যন্ত সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়েছেন৷ কিন্তু অখিলেশ যাদব উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অমর সিংয়ের সঙ্গে তাঁর খিটিমিটি শুরু হয়৷ প্রথমে চাপা টেনশন, অতঃপর একেবারে মার মার কাট কাট৷
অমর সিং খলিফা আদমি৷ জাতীয় স্তরের অপারেটর তিনি এমনি এমনি হননি৷ ব্ল্যাকমেল করার অনেক রকম মালমশলা তাঁর হাতে আছে৷ হয়তো তাঁর একান্ত বিশ্বস্ত আইনজীবীদের এমন কথাও বলা আছে যে, তাঁর হঠাৎ কিছু হলে তাঁরা যেন একটার পর একটা বোমা ফাটাতে শুরু করে দেন৷ অখিলেশ যাদব অমর সিংকে বহিষ্কৃত ঘোষণা করেছেন৷ অমর সিং অবশ্য তার অনেক আগেই অনেকটা ডিএল রায়ের আওরঙ্গজেবের কায়দায় শিবনেত্র হয়ে সংবাদপত্রে ইন্টারভিউ দিয়েছেন যে, তাঁর কিছুতেই কিছু যায়-আসে না৷ যেন তিনি কুম্ভমেলার নাগা সন্ন্যাসীর দল৷ ছাইভস্ম মেখে ব্যোম ব্যোম করেই বাকি দিনগুলি কাটিয়ে দিতে চান৷ আমার তো কেন জানি মনে হচ্ছে, সমাজবাদী পার্টির অন্দরমহলের এই তুমুল ঝগড়ার পিছনে আসলে তাঁরই উসকানি আছে৷ কারণ, অমর সিং আসলে একজন অপারেটর৷ যার কাছ থেকে তিনি বেশি ‘রোকড়া’ পাবেন, তার জন্যই তিনি যা যা কলকাঠি নাড়ার তা নাড়বেন৷ এখন সে রকম কোনও জায়গা থেকে পোস্ত খেয়েই অমর সিং যে সমাজবাদী পার্টির অভ্যন্তরে শকুনির ভূমিকা নেননি, তা কে বলতে পারে?
কৌরবপক্ষে থেকেও শকুনির মূল লক্ষ্য ছিল কৌরবদের ধ্বংসসাধন৷ হয়তো অমর সিংও উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে এখন সেই কাজটাই করছেন৷

Advertisement
----
-----