লোকসভা নির্বাচনে ভারতে বন্ধু সরকার চায় যুযুধান আমেরিকা-রাশিয়া

পার্থসারথি গুহঃ  লোকসভা নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভারতে যুযুধান দুই প্রতিপক্ষ বিজেপি ও কংগ্রেস যেন যথাক্রমে আমেরিকা ও রাশিয়ার দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২০১৯ এ ভারতে নিজেদের অনুকূল সরকার বসানোর ব্যাপারে অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে উঠেছে পরম শক্তিশালী এই দুই দেশ। তার ফলস্বরূপ যেন ভোটকে কেন্দ্র করে এখানে নিত্যনতুন চিত্রনাট্য লেখা হচ্ছে। কখনও ফেডারেল ফ্রন্ট তত্ত্ব সামনে আনা, আবার কখনও বিজেপি বা কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভারতবর্ষের বিশাল বাজারকে নিজেদের হাতে রাখার জন্য তাবড় বিদেশি শক্তি যে মরিয়া তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে আসছে। তার মধ্যে নিশ্চিতভাবে অগ্রণী নাম হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।

‌ভারতে লোকসভা ভোট যত সামনে আসছে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যস্ততা ততটাই বাড়ছে। ক্ষমতায় থাকা বিজেপি যেমন মরিয়া দিল্লির গদি অটুট রাখতে, ঠিক তেমনই বিরোধীরা মোদী সরকারকে পরাস্ত করতে যারপরনাই চেষ্টা করছেন। যদিও এর মধ্যে আবার বিরোধীদের সাধের ফেডারেল ফ্রন্টে আদৌ কেউ আছে কি না তা নিয়েই বেজায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রথম দিকে যারা ফেডারেল ফ্রন্ট নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছিল তারাই এখন রিজার্ভ বেঞ্চে চলে গিয়েছে।

তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই চন্দ্রশেখর যেমন ফেডারেল ফ্রন্ট নিয়ে খুবই হইচই ফেলেছিলেন। নবান্নে এসে মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করে এমন একটা অবস্থা গড়ে তুলেছিলেন যেন মনে হচ্ছিল এসপার ওসপার করেই ছাড়বেন। অথচ সেই ওয়াই চন্দ্রশেখর এখন অনেকটাই ব্যাকফুটে। তাছাড়া ফেডারেল ফ্রন্ট ব্যাপারটা যে আসলে একটা সোনার পাথরবাটি এটাও ক্রমে পরিস্কার হতে শুরু করেছে।

- Advertisement -

কংগ্রেসকে নিয়ে জোট হবে না তাদের বাদ দিয়ে বিরোধীরা আলাদা মঞ্চ গড়বেন সেই ব্যাপারটাও পরিস্কার নয়। আবার এনডিএ শরিকদের মধ্যে যে শিবসেনা অনেকটা বাম জমানার আরএসপি র ভূমিকা পালন করে থাকে তারাও দেখা যাচ্ছে আস্তে আস্তে উগ্র বিজেপি বিরোধিতার লাইন থেকে সরে আসছে। আবার কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধি বিদেশের মাটিতেও বসেও বিজেপির বিরুদ্ধে সার্বিক বিরোধী ঐক্যের পক্ষে সওয়াল করছেন। অর্থাৎ জোট ধর্ম পালনের অঙ্গীকার করছেন। এভাবে গিরগিটির মতোই পরিস্থিতি একের পর এক পালটে যাচ্ছে বা যাবে। এটাই রেওয়াজ, লোকসভা নির্বাচনের অব্যবহিত আগে এমন অনেক সমীকরণ গড়ে ওঠার। বস্তুত, এই প্রক্রিয়াটা নতুন নয়। ভোট যত সামনে এগিয়ে আসে এমন অনেক জারিজুরিও চলতে থাকে পাল্লা দিয়ে।

‌আরও একটা বিষয় ভারতের মতো উন্নতশীল দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে থাকে। সেটা হল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন লবিও এদেশের সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে শামিল হয়। এর মধ্যে আমেরিকা ও পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়া ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন লোকসভা ভোটে এর আগেও নাক গলিয়েছে। এর মধ্যে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এদেশে বছরের পর বছর রাজত্ব করেছে কংগ্রেস। যে কংগ্রেস আবার পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আমল থেকেই সোভিয়েত সমাজতন্ত্রর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার হাতে একরকম ক্রীড়নক হয়ে থাকে কংগ্রেস শাসিত ভারত সরকার। সোভিয়েত ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে যাওয়ার পরেও কংগ্রেস কিন্তু কিছুতেই আমেরিকার আধিপত্য মেনে নিতে পারে নি। এদেশে যখন থেকে কংগ্রেসের জায়গায় বিজেপি সরকার এসেছে তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক স্থাপনে মেরুকরণ করেছে গেরুয়া ব্রিগেড।

আজকের নরেন্দ্র মোদী জমানা বলে নয়, অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তখন থেকেই আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপনের ঐকান্তিক প্রয়াস নজরে এসেছে। মোদী জমানায় আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব আরও মজবুত হয়েছে। বস্তুত, এই সময়কালে ভারত-আমেরিকা-ইজরায়েলের একটা ত্র‍্যহস্পর্শ রচিত হয়েছে। ফের শক্তিধর হয়ে ওঠা রাশিয়া, চিন ও পাকিস্তান আবার অন্যদিকে কাছাকাছি এসে একটা অক্ষরেখা নির্মাণ করেছে। এসবই হয়েছে তখন যখন রাশিয়ান লবির কংগ্রেসের হাত থেকে ক্ষমতা হাতবদল হয়েছে বিজেপির হাতে। এবারেও ভারতে নিজেদের পছন্দসই সরকার বসাতে যে বিদেশি শক্তি প্রাণপাত করছে তা দেশের রাজনৈতিক দলগুলির ট্র‍্যাপিজের খেলা দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে।

Advertisement
---