রবিবার ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ-র সভায় জনসমাগম কম হয়নি৷ যদিও বিভিন্ন জেলায় সভায় আসার পথে অংশগ্রহণকারীদের উপর হামলাবাজির অভিযোগ করা হয়েছে, তবু লোকটা এসেছে তাতে বিজেপি-র পক্ষে অখুশি হওয়ার কারণ ঘটেনি৷

প্রতিবেদন নিখিলেশ রায়চৌধুরি
প্রতিবেদন
নিখিলেশ রায়চৌধুরী

বহু বছর আগে, তখনও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটেনি, বিজেপি-র প্রথম ব্রিগেড সমাবেশে অটলবিহারী বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদবানির ভাষণ শুনতে গিয়েছিলাম৷ রেসকোর্সের দিকে মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল, তাতেও মাঠ অর্ধেক ভরেনি৷ তার উপর শ্রোতাদের সিংহভাগই ছিলেন হিন্দিভাষী৷ কিন্তু এখন যে আর সে অবস্থা নেই এবং এ রাজ্যে বিজেপি-র জনপ্রিয়তা যে উত্তরোত্তর বাড়ছে প্রথমে লোকসভা ভোটের সময় নরেন্দ্র মোদী ও তার পর এদিন অমিত শাহ-র সভা থেকে সেটার প্রমাণ পাওয়া গেল৷

তার মানে অবশ্যই এই নয় যে, আজ বাদে কাল বিধানসভা ভোট হলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলকে গোহারা হারিয়ে বিজেপি এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসবে৷ সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে যত বেকায়দাতেই পড়ুন না কেন, এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো হিম্মত বিজেপি অর্জন করেনি৷ বাকি দেশের জন্য যা, এখানকার জন্যও তাদের হাতে সেই একটাই তাস—ঘুরেফিরে নরেন্দ্র মোদী৷ মোদী দেশের প্রধানমন্ত্রী, তিনি তো আর হররোজ পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে ঘুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে টক্কর দিতে পারবেন না৷ তাঁকে ভরসা রাখতে হবে যাঁদের উপর, তাঁরা পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নেহাত পিগমি৷

আসলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেঁসেছেন একটা জায়গাতেই৷ আর সেটা হল সারদা কেলেঙ্কারি৷ এই নয় যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন৷ জেলবন্দি কুণালকিশোর ঘোষই হোক কিংবা দেশের খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই হন, কেউ যদি তামা-তুলসী হাতে নিয়েও বলেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে সারদার টাকা খেয়েছেন, সে কথা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করবে না৷ রাজনৈতিক কারণে ড্রামাবাজি সব দলই করে, তা বলে ব্যক্তিগত জীবনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে নাটক করেন না, এ কথা বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও জানেন৷

তা সত্ত্বেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সারদা কেলেঙ্কারির সঙ্গে এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বহু কেষ্টবিষ্টুর নাম জড়িয়ে পড়েছে এবং বেশ বোঝা যাচ্ছে, তা নিয়ে তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও এই মুহূর্তে যথেষ্ট চাপে রয়েছেন৷ যে কোনও রাজনৈতিক শক্তিই সব সময় প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ খোঁজে৷ এখন সারদা কেলেঙ্কারির সূত্র ধরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারও যে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সেই সুযোগ নেবে তাতে আর আশ্চর্য কী৷ সিবিআইকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার নজিরও নতুন নয়৷ কিন্তু সারদার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তাতে এখানকার শাসকদলের বেশকিছু হোমরাচোমরার পরিত্রাণের সুযোগ খুব কম৷ শুধু তাই নয়, সেক্ষেত্রে দোষ ঢাকার চেষ্টা যত চলবে, কি রাজনৈতিকভাবে কি প্রশাসনিকভাবে দিল্লির ফাঁস ততই জোরালো হবে৷

amit-shah-kolkata1দিন কে দিন এ রাজ্যে বিজেপিও রাজনৈতিকভাবে সেই সুযোগ নেওয়ার পথেই এগচ্ছে৷ তাদের সুযোগ আরও বাড়ছে ‘উত্থান দিবসে’র সভা আটকানোর মতো প্রশাসনিক কীর্তিকলাপে৷ শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় তাদের অনুমতি দিতে বাধ্য করল৷
সভার বিভিন্ন বক্তার ভাষণে, বিশেষ করে বিজেপি-র সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ-র বক্তব্যে বার বার আগামী ২০১৬-র বিধানসভা ভোটের কথা উঠে এলেও, আপাতত তাদের লক্ষ্য যে মূলত কলকাতা পুর নির্বাচন সে কথা আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না৷ এই মুহূর্তে এ রাজ্যে তাদের প্রাপ্তিযোগ বলতে দুটি লোকসভা আসন এবং বিধানসভার একটি৷ যা মূলত মোদী ক্যারিশমারই ফল৷ সেই ক্যারিশমাকেই পুঁজি করে তারা এবার কলকাতার বুকে বড়বাজারের গণ্ডি ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ তারা এটাও ভালোমতো আন্দাজ করতে পারছে যে, বাংলার সাধারণ ভোটারদের কাছে এখন সিপিএম কিংবা কংগ্রেসের চাইতে বিজেপি-র গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে অনেকখানি বেড়েছে৷ সে কারণেই আদাজল খেয়ে আস্তিন গুটিয়ে তারা আরও বেশি করে ময়দানে নেমেছে৷

তাহলে কি এবারের কলকাতা পুর নির্বাচনেই পদ্মের কাছে পর্যুদস্ত হচ্ছে ঘাসফুল? ব্যাপারটা বোধহয় অত সহজ নয়৷ সাধারণ নির্বাচনের আগেও এ রকম একটা রব উঠেছিল৷ বাস্তবে তা ঘটেনি৷ তবে কলকাতার বহু ওয়ার্ডেই এবার পদ্ম ফুটবে৷ পুরসভা দখল করতে না পারলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকার একটা জোরালো সম্ভাবনা তাদের রয়েছে৷ কোনও কোনও বিজেপি প্রার্থী হয়তো জায়েন্ট কিলারও হবেন৷ কিন্তু তাই বলে রাত পোহালেই এ রাজ্যে বিজেপি নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করবে, এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি৷ আবারও বলতে হচ্ছে, খোদ নরেন্দ্র মোদী প্রতিদিন এসে তো আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে টক্কর দিতে পারবেন না৷

--
----
--