গায়ে বাদামী রঙের গরম চাদর৷ পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা৷ মেজাজ সুরেলা৷ তবে সরোদ ছাড়াই ঝটিকা সফরে কলকাতা আসলেও, বৃহস্পতিবার সকালে গলার সুরেই শহর মাতালেন উস্তাদ আমজাদ আলি খান৷ উপলক্ষ্য ছিল এপিজে কলকাতা সাহিত্য উৎসবের মঞ্বে তাঁর লেখা বই ‘মাই ফাদার, আওয়ার ফ্রেটারনিটি: দ্য স্টোরি অফ হাফিজ আলি খান অ্যান্ড মাই ওয়ার্ল্ড’এর প্রকাশ অনুষ্ঠান৷ তবে সাক্ষাৎকারে নিজের লেখা বই নিয়ে কথার মাঝে উঠে এল, এই প্রজন্মের কাছে ভারতীয় সঙ্গীতের সংজ্ঞা পালটে যাওয়ার কথাও৷ শুরু হল তাঁর কথা দিয়েই…

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: কলকাতায় যত বার আসি, ততবারই নতুন করে পাই শহরটাকে ৷ এই তো আমার পাশে ট্যালেন্ডেড লেখক ও সঙ্গীতকার অমিত চৌধুরী বসে আছেন৷ আমি কিন্তু ওঁর খুব বড় ফ্যান৷ তবে আজকে অমিতকে বহুবার গান গাইতে বললেও, আমাকে গান শোনাল না (হেসে ফেলে)…৷

Advertisement

কলকাতা24×7: সরোদ ছেড়ে কলম৷ তাও আবার বাবাকে নিয়ে৷ কীভাবে শুরু হল?

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: প্রায় বারো বছর আগে আমার দুই ছেলে আমান ও আয়ান আমাকে নিয়ে একটা বই লিখেছিল৷ সে বই আমি পড়েছি৷ খুব অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম৷ বলা যায় সেই সময় থেকেই ঠিক করেছিলাম বাবাকে নিয়ে একটা বই লিখব৷ আরও একটি ঘটনা যা আমাকে অনুপ্রাণিত করে৷  পুরো পরিবারকে নিয়ে ভিয়েনা গিয়েছিলাম৷ সেখানে বিটোভেনের বাড়িতে যাই৷ কি সুন্দর করে সেই দেশের সরকার বিটোভেনের সমস্ত জিনিস সংরক্ষণ করেছে৷ তাঁর পিয়ানো, তাঁর মিউজিক স্ক্রিপ্ট৷ শুধু বিটোভেন কেন, শেক্সপিয়রের মিউজিয়ামেও গিয়েছিলাম একবার৷ সেই সব দেখেই প্রথমে মনে এসেছে আমার বাবা কিংবদন্তি শিল্পী ও আমার গুরু হাফিজ আলি খানের কাজকেও সংরক্ষণ করা উচিত৷ তাই নিজেই দায়িত্ব নিলাম৷ দুঃখ লাগে, আমাদের দেশে কিংবদন্তি শিল্পীদের কাজ সংরক্ষিত হয়নি সেভাবে৷ তবে খুশির কথা অন্তত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজ তো সংরক্ষিত৷

কলকাতা24×7: শুধুই কি সংরক্ষণের খাতিরে বই লেখা? নাকি অন্য কারণও রয়েছে? Ustad

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: এখানে আমি বলতে চাই৷ প্রায় দু থেকে তিন বছর লেগেছে পুরো লেখাটা শেষ করতে৷ তার পর একদিন পুরো লেখাটা দেখে মনে হয়, দূর আমি লিখেতেই পারি না৷ গোটা লেখাটা ডাস্টবিনে ফেলে দিই৷ আয়ান আর অমন লেখাটাকে ডাস্টবিন থেকে তুলে, বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়৷ তাই ঠিক সংরক্ষণ কিনা জানিনা৷ তেবব হ্যাঁ, আমার বাবার কথা, তাঁর সঙ্গীত জীবনের কথা, সবকিছুই জানাতে চেয়েছিলাম বিশ্বকে৷ খুব কম লোকেই তো তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ জানেন না৷ কীভাবে তাঁর রক্তে শুধু সুর বয়ে বেড়াত সেটাও জানে না৷ এটা একটা মোক্ষম কারণ বই লেখার৷

কলকাতা24×7: বাবাকে নিয়ে বই লেখা মানেই তো ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাওয়া৷ কিছু ঘটনা যা লিখতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন?

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: বহু ঘটনা৷ বাবার সংস্কৃতি ছায়ায় ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া৷ আর সবথেকে বেশি বাবার কাছে সঙ্গীতের অনুশীলন৷ বাবা খুব কমই সরোদ বাজাতেন৷ উনি গান ধরতেন আর আমি সরোদে তাঁকে অনুসরণ করতাম৷ আমার বাবা ছিলেন খুবই ইনোসেন্ট আবেগপ্রবণ মানুষ৷ সঙ্গীত ছাড়া তিনি কিছুই বুঝতেন না৷

বহু মানুষ নানা কারণে বাড়িতে আসতেন৷ তিনি তাঁদের কথা শোনার আগেই সঙ্গীত নিয়ে আলোচনায় বসে পড়তেন৷ তার পর বহুক্ষণ পরে বাবার খেয়াল হত পুরো বিষয়টি৷ (হেসে ফেলে)৷ এরকম আরও ঘটনা রয়েছে৷ ১৯৬০ সালে পদ্মভূষণের সময় বাবা নেহেরুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন৷ আমি সঙ্গেই ছিলাম৷ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, উস্তাদজি কেমন আছেন? বাবা উত্তর দিলেন, ‘আমি তো ঠিকই আছি, কিন্তু দরবারি রাগের খুব খারাপ অবস্থা৷ কিছু একটা করুন সবাই তো যা খুশি করছে এই রাগ-টাকে নিয়ে৷’

আসলে বাবা সঙ্গীত নিয়েই বেঁচে থাকতেন, খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি৷ আমার একবার মনে আছে, হঠাৎ সঙ্গীতচর্চা করতে করতে বাবা বলে উঠলেন, ‘তানসেনের মেঘমল্লার বেশ খারাপ৷ উনি কি বানিয়েছেন এটা!’

কলকাতা24×7: আপনার বাবাই ছিল আপনার গুরু৷ কিন্তু অনেকেই মনে করেন সঙ্গীতের ক্ষেত্রে দু’জনেই বেশ আলাদা৷ আপনি কী মনে করেন? 

কিংবদন্তি শিল্পী হাফিজ আলি খান ৷৷
হাফিজ আলি খান ৷৷

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: হ্যাঁ, লোকে বলেন৷ কিন্তু সত্যি বলতে কি আমার তেমন কিছু মনে হয় না৷ আমি বাবাকে অন্ধের মত অনুসরণ করি৷ যদি কিছু নিজের থাকে তাহলে গোটাটাই ভগবানের আর্শিবাদ৷ এমনকি অমন-আয়ানেরও নিজস্বতা রয়েছে৷

কলকাতা24×7: বহু শিল্পীরাই বলছেন আজকাল ভারতীয় সঙ্গীত নিজস্বতা হারিয়ে পাশ্চাত্যে মিশেছে৷ আপনি কি মনে করেন?

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রয়েছে প্রচুর ইম্প্রোভাইজেশন৷ পাশ্চাত্যেও রয়েছে৷ এখানে সারেগামাপা, পাশ্চাত্যে তাই ডো রে মি সা৷ তাই মিশেল হতেই পারে৷ বিষয়টা হল, গুণগতমান৷ সঠিক ফিউশন বিরোধি আমি নই৷  বিদেশে অনুষ্ঠান করার সময় আমিও বহুবার সরোদে উই শ্যাল ওভার কাম, জলি দ্য গুড ফেলো বাজিয়েছি৷

কলকাতা24×7: আর নতুন প্রজন্মের বিষয়ে কি বলবেন?

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: এটা পুরোটাই আমাদের দায়িত্ব৷ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যেতে হবে, তবেই না তাঁরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাছে পৌঁছবে৷ আগে সাত মিনিটের এক এলপিতেই শিল্পীরা জনপ্রিয় হয়ে পড়তেন৷ প্রত্যেক এলপি তে বড় জোড় দুটো গান থাকত৷ এখন  সেই ব্যাপারটা নেই৷ ইন্টারনেটের দয়ায় হাতের মুঠোয় চলে এসেছে সারা বিশ্বের সঙ্গীত৷ আমার তো মনে হয়, নতুন প্রজন্মের মানুষের কাছেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জনপ্রিয়৷ অমন-আয়ন তো নতুন প্রজন্মেরই৷ ওদের কাছেই শুনেছি, বহু ইয়ং ছেলেমেয় কনর্সাট শুনতে আসছে৷ এই প্রজন্মের বহু ছেলেমেয়ে অনুশীলনও করছেন৷ এই প্রজন্মের একটা জিনিস আমার ভাল লাগে৷ ভালটা ওরা একসেপ্ট করে, মন্দকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুঁড়ে ফেলে দেয়৷

কলকাতা24×7: আচ্ছা শেষ প্রশ্ন৷ রাজভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে কি বলতে চান? বাবার মতই বলবেন? নাকি অন্যকিছু…

উস্তাদ আমজাদ আলি খান: (হেসে ফেলে), বহুবার ইচ্ছে হয়েছে বলতে৷ যখনই রাষ্ট্রপতি ভবনে কোনও অনুষ্ঠান হয়, তখন হিন্দি ছায়াছবির গান বাজে৷ আমি বলতে চাই, হিন্দি সিনেমার গান আমাদের ঐতিহ্য নয়৷ এর মানে আমি হিন্দি ছায়াছবির গান ভালবাসি না তা নয়, মদন-মোহনের সুরে ‘মেরা ছায়া’ সিনেমার গান ‘তু জাঁহা, জাঁহা চলেগা…’ ভীষণ প্রিয় আমার৷ আনন্দী রাগকে কি অপূর্বভাবে ব্যবহার করেছেন তিনি৷ আসলে গুণগতমানটাই আসল৷

সাক্ষাৎকার: আকাশ মিশ্র ৷৷

 

 

 

 

 

 

 

----
--