শেষের দিন গুনছে নেতাজীর নিয়মিত শরীরচর্চার আখড়া

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: একসময় সুভাষ চন্দ্র বোসের নিয়মিত শরীরচর্চার স্থান ছিল এটাই। শরীরচর্চা করতে আসতেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। সেদিন গিয়েছে। একসময়ে বিখ্যাত মানুষদের শরীরচর্চার কেন্দ্র কুস্তির আখড়া ‘অর্জুন ব্যায়ামশালা’র অবস্থা ক্রমে সঙ্গীন হয়েছে।

হাওড়া থেকে গিরীশ পার্ক যাওয়ার আগে পড়বে তারাসুন্দরী পার্ক। পার্কের গা ঘেঁষে একটি গলি চলে গিয়েছে। সেখানেই ইতিহাসের ‘বোঝা’ বইতে বইতে নুইয়ে পড়ে রয়েছে ‘অর্জুন ব্যায়ামশালা’। এখনও কিছু কুস্তিগির নিয়মিত অভ্যাস করেন। কিন্তু ওইটুকুই। দিনে দিনে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে মহানগরের অন্যতম পুরনো কুস্তি আখড়ার। উন্নয়নের মিছিল শহর জুড়ে। নেতাজির অন্তর্ধান মাথায় চাগাড় দিলে কখনও কখনও সরব হয় কেন্দ্র থেকে রাজ্য সরকার। কিন্তু নেতাজির পায়ের ধুলো পাওয়া কুস্তির আখড়া? তা নিয়ে কারোর মাথাব্যাথা হয় না বলেই অভিযোগ আখড়ার বর্তমান কুস্তিগিরদের।

- Advertisement -

যাত্রা শুরু হয়েছিল অর্জুন পালোয়ানের হাত ধরে। তিনি একাধারে কুস্তিগির , একাধারে স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। অর্জুন পালোয়ানের ছেলে দীননাথ পালোয়ান বলেন, “আমার এই আখড়ার শুরু করেছিলেন। কলকাতার সবথেকে পুরনো কুস্তির আখড়া। আমার বাবা অর্জুন সিং ওরফে রামনাথ মিশ্রর সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল নেতাজীর। সেই সূত্রেই ওনার এই আখড়ায় শরীর চর্চা করতে আসা।” ১৯৩৪ সালে এই কুস্তির আখড়া ছিল সত্যনারায়ণ পার্কের কাছে। পরে স্থান পরিবর্তন করে আসে তারাসুন্দরী পার্ক লাগোয়া এই গলিতে। সেই সময় থেকেই নেতাজীর এখানে আসা যাওয়া শুরু। দীননাথ মিশ্র বলেন, “উনি ওই সময় প্রত্যেকদিনই আসতেন।” ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও নেমেছিলেন অর্জুন পালোয়ান নিজে।

দীননাথ মিশ্র এও জানালেন, “ শোনা যায় বিনয়, বাদল, দীনেশও বাবার সঙ্গে শরীরচর্চা করতেন। এখানে শরীরচর্চা করতে আসতেন বিধানচন্দ্র রায় , সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা। কাজে বুঝতেই পারছেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই আখড়ার ইতিহাস।” কিন্তু সেই ইতিহাস কি কোনও কাজে এসেছে ? দীননাথ স্পষ্ট জানালেন, “ইতিহাস পাতায় লোকের মুখে থেকে গিয়েছে। কিন্তু আদতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ।”

গুরুত্ব পায়নি বলেই চোখের সামনে দেখতে খারাপ লাগবে কিভাবে আখড়ার টিনের চাল ভেঙে পড়ছে। খসে পড়ছে দেওয়ালের পলেস্তরা। তার মধ্যেই চলছে দীননাথসহ আরও জনা পঞ্চাশেক কুস্তিগিরদের নিয়মিত চর্চা। প্রতিদিন সকাল আটটা বাজলেই দেখা মেলে পালোয়ানদের অভ্যাসের। মুলতানি মাটিতে তেল হলুদ মিশিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে অভ্যাস। সঙ্গে রয়েছে খাওয়া দাওয়ার বিষয়টাও, যা যথেষ্ট খরচ সাপেক্ষ বলেই জানাচ্ছেন কুস্তিগিররা।

কোনওরকম সাহায্যও আসে না বলে অভিযোগ। সমস্যা বাড়িয়েছে পাড়ায় পাড়ায় ক্লাবে ক্লাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মাল্টিজিম। সেগুলোই এখন শরীরচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এসবে রাজ্যসরকারের ২ লক্ষ টাকা করে সাহায্য আসে। কিন্তু ইতিহাসের প্রাপ্য শুধুই প্রতিশ্রুতি। এই ভিড়েই হারিয়ে যাচ্ছে সমস্ত ‘সংগ্রাম’।

ছবি- মিতুল দাস।

Advertisement ---
---
-----