‘অ্যালার্জির বহু রূপ-প্রকাশের একটি হল অ্যাজমা’

আগের তুলনায় বেড়ে চলেছে অ্যাজমা অর্থাৎ, হাঁপানি৷ কিন্তু, হাঁপানি কি সেরে যায়? তা হলে, এই অসুখটা আসলে কী? অ্যাজমা কি অ্যালার্জির-ই প্রকাশ? আর, এই অসুখের চিকিৎসা মানেই কি ইনহেলার? না, চিকিৎসার অন্য পদ্ধতিও রয়েছে? শুধুমাত্র তাই নয়৷ অনেকে এমনও মনে করেন যে, শীতের সময়ই হাঁপানি বেড়ে যায়৷ সত্যিই তাই? তা হলে, এই অসুখ প্রতিরোধের উপায়-ই-বা কী? অ্যাজমার কোনও প্রতিষেধক আছে? এমনই বিভিন্ন বিষয়ে www.kolkata24x7.com-এ বলছেন ন্যাশনাল অ্যালার্জি অ্যাজমা ব্রঙ্কাইটিস ইনস্টিটিউট-এর অধিকর্তা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক আলোকগোপাল ঘোষাল

আরও পড়ুন: কলকাতায় এ বার উবের ক্যাব চালাবেন যৌনকর্মীরা

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক আলোকগোপাল ঘোষাল৷
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক আলোকগোপাল ঘোষাল৷

হাঁপানি অসুখটা ঠিক কী? এক কথায় শ্বাসনালির সংকোচন৷ লজ্জাবতী লতা যেমন স্পর্শ মাত্রই গুটিয়ে যায়, তেমনই হাঁপানি রোগীর শ্বাসনালিও আপনা আপনি বা সামান্য মাত্র উসকানিতে সংকুচিত হয়ে যায়৷ কিন্তু, এই সংকোচন তো একটা পরিণাম৷ শুরুটা কোথায়? বংশানু এবং পরিবেশের যোগসাজসে শ্বাসনালির প্রদাহই হচ্ছে আসল অসুখ৷ এ যেন তুষের আগুন, ধিকি ধিকি করে জ্বলতেই থাকে এবং যে ক্ষতি হয়, তাকে আর ফেরানো যায় না৷ এই ব্যাপারটার বৈজ্ঞানিক নাম Airway Remodelling অর্থাৎ, একটা আঙুল উড়ে গেলে যেমন তাকে ফেরানো যায় না, হাঁপানির ক্ষেত্রে শ্বাসনালির ক্ষতিও তাই৷ তার মানে হাঁপানির চিকিৎসা যত আগে শুরু করা যাবে, ততই মঙ্গল৷ হাঁপানি অসুখটা অনেক সময়ই অ্যালার্জি বা শরীরের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার প্রকাশ৷ যা কি না কখনও শুধু গায়ে চুলকায় (সহজ বাংলায় যাকে আমবাত বলে) কেউ বা শুধু সারা বছর হেঁচে যান, কারও বা বিশেষ কোনও খাবার খেলেই বমি, পায়খানা শুরু হয়, আবার কারও বা শ্বাসনালি সংকুচিত হয়ে যে অসুখ তৈরি করে, তাকেই বলে হাঁপানি বা অ্যাজমা৷

- Advertisement -

আরও পড়ুন: সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

অ্যালার্জির বিভিন্ন অংশ: অন্ধের হস্তি দর্শন৷ ছয় জন অন্ধ হাতি দেখতে গিয়েছিলেন৷ এই গল্পটি নানা ভাবে লোকের মুখে ঘোরে৷ একটি ইংরেজি কবিতায় আছে – Six men of Hindusthan / (to knowledge much inclined) / Went to see an elephant / Though all of them were blind. তো কেউ ধরেছে তার শুঁড়, সে ভেবেছে হাতি যেন মোটা ময়াল সাপ৷ কেউ পা জড়িয়ে ধরে বুঝে নিয়েছে হাতি একটা থাম, ইত্যাদি৷ অ্যালার্জির ব্যাপারটাও তাই৷ একদম ছোট বেলায় কারও চিংড়ি মাছ খেলেই গায়ে ফুলে উঠত, যাকে বলে আমবাত (Urticaria)৷ একটু বয়স বাড়তেই দিন-রাত নাক দিয়ে জল পড়া আর হাঁচি, ১০ বছর বয়স থেকে মেয়ের বা ছেলের রাত্রে কাশিতে ঘুম হত না, আর ৩৫ বছর বয়সে প্রথম শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে – এর সবটাই একটি অ্যালার্জির বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র৷ সবই একটা অসুখ – অ্যালার্জি৷

আরও পড়ুন: প্রথার নামে প্রকাশ্যে গণধর্ষণ যেখানে এখন এক খেলা!

বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এর নাম অ্যালার্জি মার্চ৷ যেহেতু জিনের মধ্যেই রয়েছে অ্যালার্জির বা খুঁতখুঁতানির বীজ এবং জিন তো আছে শরীরের সমস্ত কোষে – শরীরের যে কোনও অংশে এবং যে কোনও বয়সে তার লক্ষণ প্রকাশ হতে পারে৷ এ বারে বংশানু ও পরিবেশ – এই দুই কুশীলবের অসংখ্য পারমুটেশন কম্বিনেশন তৈরি হতে পারে এবং সেই অনুযায়ী রোগী কখনও যান চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে, কখনও ইএনটি বিশেষজ্ঞের কাছে, কখনও পেটের ডাক্তারের কাছে৷ সর্বশেষে বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে, যখন শ্বাসকষ্ট শুরু হয়৷

আরও পড়ুন: হাসপাতালে বেড না পেলে পৌঁছে যেতে হবে কালীঘাটে!

বলে রাখা ভালো ‘অ্যালার্জি মার্চ’ সকলের জন্য একই ক্যালেন্ডার মেনে চলে না৷ কারও ৩৫ বছর বয়সে হাঁপানি প্রকাশ পাচ্ছে, কারও বা পাঁচ বছরে৷ মোটের উপরে জেনেটিক বা বংশানুর ভাগ যত বেশি হবে তত তাড়াতাড়ি অসুখ প্রকাশ পেতে পারে৷ তা হলে অ্যালার্জি ব্যাপারটা এক কথায় আমরা বলতে পারি ‘আপনার শরীরের জিনগুলো খুঁতখুঁতে৷ ফলে ত্বক, নাসিকা, শ্বাসনালি এমনকী খাদ্যনালী (অপরাধ নেবেন না, হয়তো চরিত্রও) খুঁতখুঁতে৷ কিন্তু শুধু বংশানুতে থাকলেই তো অসুখ হয় না৷ সেই অর্থে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, এমনকী ক্যানসারের জিনও আমাদের সকলেরই শরীরে থাকে৷ শুধু বংশানুতে হবে না, সঙ্গে পরিবেশের যোগসাজশ চাই অসুখটা প্রকাশ পাওয়ার জন্য৷ তাই বাচ্চার মা যখন বলেন, আমাদের বংশে কারও হাঁপানি নেই, আমরা সবিনয়ে জানাই, কথাটা হবে আমাদের বংশে কারও জানা নেই৷

আরও পড়ুন: ৪.৫ কোটি ভুক্তভোগীতেও চাপা পড়ে যাবে সারদাকাণ্ড!

অর্থাৎ, ধরুন যে বাচ্চাটির হাঁপানি আছে বলে জানা গিয়েছে, তার মাসি হয়তো ছোটবেলায় ‘টনসিলের অসুখে’ ভুগতেন, মা নিজেই ভুগতেন ‘ভয়ঙ্কর সর্দি কাশিতে’ – এগুলো আসলে একই অসুখের বিভিন্ন প্রকাশ, লোকে তা সব সময় বুঝতে পারেন না৷ আরও আছে৷ শুধু বংশানুতে হাঁপানি অসুখ হয় না৷ ঠিক ঠিক পরিবেশের সহযোগ না পেলে তারা অসুখ তৈরি করতে পারে না৷ ধরা যাক দুই যমজ ভাই৷ হিন্দি সিনেমার ধাঁচে জন্মেই দু’ জন আলাদা হয়ে গিয়েছে – একজন খুব শুকনো পাথুরে জায়গায় এবং অন্যজন থেকে গিয়েছে এই আর্দ্র শস্যশ্যামলা বাংলায়৷ হতে পারে বাংলার এই ভাই পরিবেশের সহায়তায় হাঁপানিতে ভুগবে, অন্য জন সারা জীবন টেরই পাবে না৷

আরও পড়ুন: পূর্ব ভারতের বিরল নজিরে রক্ষা পেল কিশোরীর প্রাণ

তা হলে সারাংশ এই হল যে, অ্যালার্জির বহু রূপ ও প্রকাশ৷ হাঁপানি সাধারণত তার মধ্যে একটা৷ গোটা অসুখই প্রায় ৬০ শতাংশ বংশানুগত (বংশগত বলা হচ্ছে না), বাকি ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী পরিবেশ৷ (দ্বিতীয় কিস্তি)

আগের কিস্তি পড়ুন: ‘সত্যকে জানলে-বুঝলে সম্পূর্ণ সেরে যায় অ্যাজমা’

পরের কিস্তি পড়ুন: ‘বিছানার অসংখ্য কীট বাড়িয়ে তোলে অ্যালার্জি’

_________________________________________________________________

আরও পড়ুন:
(০১) বিশ্বাসযোগ্যর নামে ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা!
(০২) ভালো বাসা-র তুলনায় ইলিশ যে বেশি ভালোবাসার!
(০৩) মুমূর্ষুর প্রাণরক্ষায় ক্যাসুয়ালটি ব্লক চাইছেন ডাক্তাররা
(০৪) সরকারি নির্দেশেই অকেজো মাল্টি-সুপার হাসপাতাল
(০৫) ভালোবাসার অধিকার প্রাপ্তির জন্য আর্জি প্রধানমন্ত্রীকে
(০৬) ‘সারদার সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে মমতার সরকার’
(০৭) দাভোলকর-পথে কুসংস্কারের ক্রম মুক্তি হবে বাংলায়!
(০৮) রাজনীতির ফাঁদে ইউনানির সরকারি অধিগ্রহণের স্বপ্ন
(০৯) মুখ্যমন্ত্রীর ‘নজরে’ই চারমাস বন্ধ রে-পরিষেবা
(১০) তৃণমূলের ডাক্তাররাই মেনে নিলেন চিকিৎসার ব্যর্থতা
(১১) ‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’

_________________________________________________________________

Advertisement ---
---
-----