মৃত্যুর পর সিপিএমকে ভুল প্রমাণ করেছেন অটল, সোমনাথ

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিদগ্ধ দুই চরিত্রই ভুল প্রমাণ করেছেন সিপিএমকে৷ ১৩ অগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বহিষ্কৃত সিপিএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়৷ ঠিক তিনদিন পর ভারতের রাজনীতিতে আবার ইন্দ্রপতন৷ জীবনাবসান হয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ীর৷ সোমনাথ এবং অটলবিহারীর মধ্যে মতাদর্শগত ফারাকের দূরত্ব ছিল প্রায় কয়েক আলোকবর্ষ৷ কিন্তু জীবনান্তে, তাঁদের মধ্যে এক অদ্ভূত মিল পর্যবেক্ষণ করেছে রাজনীতির বিশ্লেষকরা৷ মৃত্যুর পরে ওই দুই ব্যক্তির সম্পর্কেই মতামত বদলেছে সিপিএম৷

অটলবিহারী বাজপেয়ী সম্পর্কে সময়ে-অসময়ে সিপিএম (এবং বামেরা) এক সময় বলতেন, তিনি আরএসএস-এর মুখোশ৷ বিজেপি এবং আরএসএসের মধ্যে গোপনে সংযোগস্থাপন করেন৷ এনডিএ সরকারের সম্পর্কে সিপিএমের অতি পুরানো ধারণা, পর্দার আড়াল থেকে ওই সরকার চালায় আরএসএস৷

সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় অধ্যক্ষের পদে থেকে ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেননি৷ অধ্যক্ষের পদে থেকে তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চেয়েছিলেন তিনি৷ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে ‘সাম্প্রদায়িক’ শক্তি বিজেপির হাত শক্ত করতে চাননি সোমনাথ৷ কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে ভিত্তিতে সোমনাথকে বহিষ্কার করে সিপিএম৷

- Advertisement -

সোমনাথের মৃত্যুর পর পলিটব্যুরো যে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে তাতেই পরিষ্কার সোমনাথকে নিযে প্রকাশ কারাটের একগুঁয়েমিকে আর প্রশ্রয় দিতে নারাজ সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি৷ সোমনাথের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরে দিল্লির এ কে গোপালন ভবনে পৌছে পলিটব্যুরোকে প্রাক্তন অধ্যক্ষের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে বার্তা প্রকাশ করতে বাধ্য করেন সীতারাম৷ সাংসদ এবং অধ্যক্ষ হিসেবে সোমনাথের অবদানকে শোকবার্তায় স্বীকার করতে বাধ্য হয় সিপিএম৷ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটিও পরে শোকবার্তায় সোমনাথের নামের আগে কমরেড শব্দটি বসিয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়৷ সিপিএমের রাজ্য কমিটির এক নেতার কথায়, ‘‘শেষযাত্রায় কমরেড সোমনাথকে সীতারামের হাত তুলে স্যালুটের দৃশ্য দেখে ভালো লাগলো৷ নরে অন্তত সম্মান ফিরে পেল মানুষটা৷’’

অটলবিহারী বাজপেয়ীর সম্পর্কে সিপিএমের সুষ্পট ধারণা, তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন৷ বিরোধীদের সম্মান করতেন৷ কোনও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন৷ শুক্রবার বিজেপি সদর দপ্তরের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যান সীতারাম ইয়েচুরি এবং সিপিআই নেতা ডি রাজা৷

সিপিএম এবং সিপিআই-য়ের অন্দরেই অটলবিহারী সম্পর্কে নানান স্মৃতি রোমন্থন করছেন বর্ষীয়ান কমরেডরা৷ এক সময় ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের ব্যাপক প্রতিবাদ জানিয়েছিল বামপন্থী দলগুলি৷ উপসাগরীয় যুদ্ধে ভারত কী অমেরিকার দোসর হবে? এই প্রশ্নে বাজপেয়ীর সরকারকে বিঁধতে তৈরি হচ্ছিল বামেরা৷ সেই সময় সর্বদল বৈঠকে সিপিআই-এর এ বি বর্ধন এবং সিপিএমের হরকিষণ সিং সুরজিৎকে ডাকেন বাজপেয়ী৷ কমরেডরা ইরাকের বিরুদ্ধে ভারতের সেনা পাঠানোর বিরোধীতায় অটল ছিলেন৷ তা মেনে নেন বাজপেয়ীও৷ তিনি সুরজিৎ ও বর্ধনকে বলেন, ‘‘আপনারা রাস্তায় নেমে পড়ুন৷ অন্দোলন করুন৷’’ পরদিনই সংসদে একটি Resolution পাশ হয়৷ ইরাকের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীতে অংশগ্রহণ করবে না ভারত৷

কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ই কে নায়নারের সঙ্গেও অটলবিহারী বাজপেয়ীর মধুর সম্পর্ক ছিল৷ অনেকবার তাঁদের দু’জনকে এক ফ্রেমে ক্যামেরাবন্দী করা গিয়েছে৷ কলকাতায় বক্তব্য রাখতে এসে বাজপেয়ী একবার আক্ষেপ করেছিলেন, ‘‘জ্যোতিবাবু আমার সরকারকে বর্বর সরকার বলেছেন …৷’’ কিন্তু জ্যোতিবাবু বা বামপন্থীদের সম্পর্কে কোনও কটূ মন্তব্য করেননি বাজপেয়ী৷ হয়তো এই ধরণের কিছু কারণেই, সংশোদীয় গণতন্ত্রে তিনি উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন৷

সোমনাথ এবং অটল, দুজনেই জীবদ্দশায় যেভাবে বিচার করেছে সিপিএম, মৃত্যুর পরে সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে৷ নিজস্ব জীবনকীর্তিই ওই দুই ব্যক্তিত্বকে সাহয্য করেছে সিপিএমকে ভুল প্রমাণ করতে৷

Advertisement ---
-----