‘বন্ধু পরিবর্তন করতে পারেন, প্রতিবেশি নয়’ বাজপেয়ীকে বুঝতে পারেনি পাকিস্তান

দেবময় ঘোষ: ‘‘বন্ধু পরিবর্তন করতে পারেন, প্রতিবেশি নয়৷’’ অটলবিহারি বাজপেয়ীর বিখ্যাত সেই উক্তিই অমর হয়ে রইল৷ শেষ বাহাত্তর বছরেও ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব শেষ হয়নি, মেলেনি শান্তির পথ৷ কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার রাস্তায় দিল্লি থেকে লাহোরে বাজপেয়ীর বাসযাত্রা তাঁর মৃত্যুর পরেও দুই দেশের টানপোড়েনের সম্পর্কে একমাত্র আলোক রেখা হিসেবে বেঁচে রইলো৷

১৯৯৯ সাল৷ পোখরান পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল ওই বাস যাত্রায়৷ দুই দেশের পরমাণু-পরীক্ষার পর উপমহাদেশের শান্তি বিঘ্নিত৷ দু’দেশের বিদেশ দপ্তর শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১৯৯৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যে চুক্তি করেছিল, পরবর্তীকালে ওই চুক্তিই লাহোর ঘোষণার ভিত্তি প্রস্তুত করে৷ ১৯৯৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বিদেশ দপ্তর (Foreign Office) জানায়, রাষ্ট্রীয় সফরে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী৷ দুই দেশের মধ্যে বাস পারিষেবাও শুরু হতে চলেছে৷ পাকিস্তান সরকার বোধহয় তখনও ভাবেনি, ওই বাসে চড়ে বসবেন স্বয়ং অটলবিহারি বাজপেয়ী৷

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরিফ ওয়াঘায় বাজপেয়ীকে অভ্যর্থনা জানান৷ সঙ্গে ছিল তাদের সেনাও৷ তবে সে দৃশ্য দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে ঠিক এক বছর আগেই পরমাণু-পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দু’দেশের আকচা-আকচি চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বিশ্ব নেতৃত্বকে৷ তবে যে মানুষ কাব্যের ছন্দে বেঁচে থাকেন, পড়শির বিশ্বাসঘাতকতা তাঁকে দমিয়ে রাখবে কী করে? পরবর্তীকালে অবশ্য নওয়াজ দুঃখই দিয়েছিলেন তাঁকে৷

- Advertisement -

লাহোর ঘোষণার তাক্ষণিক ফলাফল কারগিলের যুদ্ধ৷ পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দিতে এক মূহূর্ত দেরি করেননি বাজপেয়ী৷ সন্ত্রাসবাদীদের পোশাকে পাক সেনা কাশ্মীর উপত্যকায় ১০০ পোস্ট দখল করে বসেছিল৷ কারগিল উপত্যকা, দ্রাস, বাটালিক এবং আখনুর সেক্টরে বিদেশীদের পাহাড় চুড়া থেকে উৎপাটিত করে ভারতীয় সেনা৷ ঐতিহাসিক ‘অপরেশন বিজয়’ এখনও কাঁটার মতো যন্ত্রণা দেয় পাকিস্তানের সেনাকে৷ যুদ্ধে নিহত পাক সেনা জাওয়ানদের দেহ ফিরিয়ে না নিয়ে সেই বিড়ম্বনাকে আরও বাড়িয়ে দেন তৎকালীন পাক সেনাপ্রধান পারভেজ মুশারফ৷

অপরেশন বিজয়ের সময় বাজপেয়ীর কূটনৈতিক ভূমিকাকে কুর্ণিশ জানিয়েছিল সারা বিশ্ব৷ যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ টেলিফোনে বাজপেয়ীকে জানান, কারা ‘লাইন অব কনট্রোল’ অতিক্রম করে কাশ্মীরে ঢুকেছে, তা তিনি জানেন না৷ পাকিস্তানি সেনা নয়, হতে পারে Local Irregulars (মুজাহিদিন)-রা গিয়েছে৷ বাজপেয়ী তাঁকে জানান, ‘‘একদিকে আপনি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছেন৷ লাহোরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন৷ অন্যদিকে কারগিলে পাক সেনা ঢুকেছে৷ পাক সেনাকে হঠাতে ভারতীয় সেনাকে সূর্ণ স্বাধানতা দেওয়া হয়েছে৷ হতোদ্যম হয়ে ফোন রাখেন নওয়াজ৷ তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিন্টন তাঁকে কাশ্মীর থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেন৷ ক্লিন্টনকে মুখের ওপর না করে বাজপেয়ী বলেছিলেন, আমি ‘লাইন অব কনট্রোল’ পেড়িয়ে যাইনি৷ পাকিস্তানি সেনা ‘লাইন অব কনট্রোল’ পেরিয়েছে৷ ওদের সরে যেতে বলুন৷ না হলে আমি সরব না৷

ইতিমধ্যেই পাক সেনার হাল রীতিমতো খারাপ৷ নীচ থেকে বোফর্স কামানের গোলায় জেরবার পাক সেনা পিছনে ফিরে পালাতেও পারছিল না৷ কারণ বাঙ্কারের বাইরে বেরলেই ভারতীয় বায়ু সেনার MiG-27 ও MiG-29 এর হামলায় তাদের খড়কুটোর মতো প্রাণ যেতে থাকে৷ এদিকে রসদও ফুরিয়ে আসছিল৷ পরবর্তীকালে পাক সেনার পদাধিকারিরাই স্বীকার করেছিলেন, কামান-বিমানের সাঁড়াশি আক্রমণে অসহায়ভাবে প্রাণ গিয়েছিল পাক সেনার৷ বিপদ বুঝে নওয়াজ ওয়াশিংটনে ক্লিন্টনের সঙ্গে দেখা করেন৷ ক্লিন্টন তাঁকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, পাক সেনা পত্যাহার করে নিন৷ আর কোন উপায় নেই৷ তবে সেই কাজ করা সহজ ছিল না নওয়াজের পক্ষে৷ কারণ ততদিনে তিনি বুঝে গিয়েছেন সেনাপ্রধান পারভেজ মুশারফ কারগিলের সেনা অভিযানের কোনও খবরই তাঁকে দেননি৷ নিজের দেশের সেনাপ্রধানই তাঁর সাথে প্রতারণা করেছেন৷

২০০১ সালে আগ্রা সম্মেলনে যোগ দিতে পারভেজ মুশারফ ভারতে এসেছিলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে৷ ততদিনে তিনি পাকিস্তানে সেনানায়কের ভুমিকায় এসে গিয়েছেন৷ সেনাপ্রধান হিসেবে কারগিলে Misadventute করে তিনি যে ভুল করেছেন, ততদিনে ভালোই বুঝেছেন মুশারফ৷ যদিও আগ্রা সম্মেলন ফলপ্রসু হয়নি, তবে বাজপেয়ীর রাজনৈতির সদিচ্ছা নিয়ে কুন্ঠাহীন প্রশংসা করেছিলেন মুশারফ৷ পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপুঞ্জের সম্মেলনে বাজপেয়ীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের দেশেই প্রশ্নের মুখে পড়েন মুশারফ৷

এমন এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব যে বাসে করে লাহোর পাড়ি দেবেন, বলাই বাহুল্য৷ কারণ তিনি মনে করলেন, ‘‘বন্ধু পরিবর্তন করতে পারেন, প্রতিবেশি নয়৷’’

Advertisement
---