বাংলা নাটকে ‘অমল কমল বিমল-দের’ থেকে একেবারেই আলাদা হলেন বাদল সরকার৷ বাংলায় নাটকে তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষা জন্ম দিয়েছিল থার্ড থিয়েটারের৷ গত শতাব্দীর ষাট সত্তরে দশকে যখন লাতিন আমেরিকার থার্ড সিনেমা যেভাবে হলিউডি ছবিকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেদের আদলে গড়ে তুলেছিল ঠিক তখনই বাদল সরকার বাংলা নাটক নিয়ে কাজ করছেন৷ থার্ড সিনেমা যেমন একান্তভাবেই নিজেদের অর্থাৎ “লাতিনীয়” হয়ে উঠছিল ওই সময়কার সেখানকার মানুষের কাছে ঠিক তেমনই আবার বাংলায় বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারও হয়ে উঠেছিলো পুরোমাত্রায় দেশীয়। এই দেশীয় নাটক তাই সমাজের সকল শ্রেণীর কাছে বোধগম্য হয়ে উঠতো। একেবারে নকশাল আমলে বাদল সরকারের নাটকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আরও বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল৷ তখন সেই নাটকগুলি মঞ্চের ঘেরা গন্ডি ভেঙে একেবারে প্রকাশ্য জনপথে বেরিয়ে এসেছিল৷ তৈরি করেছিলেন নিজস্ব নাটকের দল শতাব্দী৷ সেই সময়ের তাঁর নাটকের বার্তা দেশে আধুনিক নাট্যকার হিসেবে মারাঠি ভাষায় বিজয় টেন্ডুলকার, হিন্দিতে মোহন রাকেশ এবং কানাড়ি ভাষায় গিরিশ কার্নাডের পাশাপাশি বাংলায় বাদল সরকারের নাম উঠে এসেছিল।
১৯২৫ সালের ১৫ জুলাই জন্ম হয় সুধীন্দ্র সরকারের যিনি পরবর্তী কালে পরিচিত হন বাদল সরকার নামে৷ ১৯৬৮ সালে সঙ্গীত নাটক আকাডেমি এবং ১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী খেতাব পান তিনি৷ ১৯৯৭ সালে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি ফেলোশীপ থেকে ভারত সরকারের সর্ব্বোচ্চ  পুরষ্কার “রত্ন সদস্য” পদকে তাকে সন্মানিত করা হয়।  তবে এই নাট্যব্যক্তিত্ব পেশাগত দিক থেকে ছিলেন টাউন প্ল্যানার৷ শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এই প্রাক্তনী টাউন প্ল্যানার হিসেবে কাজ করেছেন ভারতের পাশাপাশি ইংল্যান্ড ও নাইজেরিয়াতে৷ আবার সাহিত্য নাটকের প্রতি আগ্রহের জন্য রীতিমতো বৃদ্ধ বয়েসে যাদবপুরে পড়তে আসেন কম্পারেটিভ লিটারেচার৷ ১৯৯২সালে সেখান থেকে এমএ পাশ করেছিলেন তিনি৷ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১১ সালের ১৩মে তাঁর মৃত্যু হয়৷ghora
১৯৫৬ সালে বাদল সরকার প্রথম নাটক ‘সলিউশন এক্স’ লেখেন। তবে এটি মৌলিক ছিল না, নাটকটি লেখা হয়েছিল ‘মাঙ্কি বিজনেস’ সিনেমা অবলম্বনে। তার পরে বাদলবাবু আরও কয়েকটি মৌলিক নাটক লিখলেও তাঁকে সর্বভারতীয় খ্যাতি এনে দেয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ই নাটকটি। এই নাটকটি বহুরূপী পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল৷ তারপর তাঁর রচিত  ‘বাকী ইতিহাস’ ‘প্রলাপ’, ‘পাগলা ঘোড়া’ ‘শেষ নাই’ সবকটিই শম্ভু মিত্রের নেতৃত্বাধীন বহুরূপী গোষ্ঠীর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয়৷

তবে নিজের নাট্যদল শতাব্দী গঠনের পর তিনি একেবারে কলকাতার কার্জন পার্কে খোলা আকাশের নিচে নাটক করা শুরু করেন৷ আসলে বাদল সরকারের পরীক্ষা নিরীক্ষায় থার্ড থিয়েটারের উৎপত্তি সামন্ত সমাজের সেই গুটিকয়েক শিক্ষিতের দ্বারা, যারা ভূস্বামী বা কৃষক কোন শ্রেণীর মধ্যে পড়ে না। অনেক সময় তাঁর নাটকে কোন প্লট থাকে না। চরিত্রের সুনির্দিষ্ট কোন চরিত্রায়ন নেই ফলেবাধ্যবাধতকতা নেই সুনিদিষ্ট পোশাকের৷ অভিনেতা–অভিনেত্রীরা ইচ্ছে মতো চরিত্র বাছাই করে নেন, নাটকের মাঝখানে চরিত্র বদলেরও স্বাধীনতা থাকে৷ প্রয়োজন বুঝলে দর্শকেরাও অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন৷ঠিকই অংশগ্রহণ সে ভাবে আক্ষরিক অর্থে নয়, খুব জোড়ালোভাবে কিন্তু দর্শক ঢুকে পড়েন কিছু একটা করতে যা অনেকটা সিনেমার ‘এক্সট্রা’দের মতো৷ বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার আন্দোলন ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী তথা রাষ্ট্রবিরোধী৷ শহরাঞ্চলকে ভিত্তি করে তাঁর ‘ভোমা’ নাটকের পাওয়া যায় নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রামের প্রতিফলন৷ আবার ‘মিছিল’ নাটকে উঠে আসে ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিবাদ আর তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা ৷

প্রতিবেদন : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

----
--