সেলোটেপ থেকে ন্যাপথালিন! বিপুল ছাড়ের স্মৃতি নিয়েই দাঁড়িয়ে থাক বাগরি

আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা যেমনই হোক টুথপেস্টের প্যাকেটে যদি টুথব্রাশ ফ্রি লেখা থাকে, মনে পড়ে সেটা না নিয়ে আপনি কখনও বাড়ি ফিরেছেন? আপনি সত্যি বললে উত্তরটা অবশ্যই না হবে। কিছু ছাড় বা ফ্রি’তে পেলে তার লোভ সামলানো মুশকিল। আর সেজন্যই বোধহয় ‘SALE’ কথাটা বাজারে এতটা জনপ্রিয় হয়ে যায়। এই একটা কথাই ক্রেতার হৃদয় দুর্বল করার পক্ষে যথেষ্ট।

আর শপিং যদি আপনার নেশা হয়, সঙ্গে চান দুর্দান্ত ‘সেল’! ধর্মতলা, গড়িয়াহাটের আগে আপনার প্রথম পছন্দ হবে বাগরি মার্কেট। এককথায় সাধ আর সাধ্যের মেলবন্ধন ঘটতো বাগরি মার্কেটে। তবে এত দিনের চেনা ছবিটার সঙ্গে আজকের ছবিটার মিল পাবেননা আপনি। গত ১৪ ঘণ্টার ভয়াবহ আগুনে বাগরি মার্কেটকে চেনা দুষ্কর। আপনার নেশা ও প্রায় কয়েক হাজার মানুষের কর্মক্ষেত্র আজ কার্যত জতুগৃহে পরিণত। কতদিনে আবার ছন্দে ফিরবে বাগরি সেই উত্তর বোধহয় কারুর কাছেই নেই। আবার কবে সেই আগের মতো এ দোকান থেকে ও দোকান ঘুরতে ঘুরতে আপনার পছন্দের জিনিসটা বিপুল ছাড়ে বেছে নেওয়ার সুযোগ আপনি পাবেন তার উত্তর শুধু সময়ই দিতে পারে।

কেমন ছিল বাগরি মার্কেট?
আজকের এই আকাশচুম্বী কালো ধোঁয়া সরিয়ে ঘুরে আসুন সেইসব দিন গুলোতে…

দুর্গাপুজো, নববর্ষ বা ইদ নয় সারা বছরই যেন এখানে চৈত্র সেলের বাজার। শহরের শপিং মলগুলির চেনা জৌলুশ থেকে বহু দূরে বাগরি ছিল নেহাতই সাদামাটা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরাদরি, হরেক খেলনার শব্দে সকাল থেকে রাত মুখরিত হত গোটা বাজার। ১৫০ বছরের পুরোনো এই বাজারে আজ শুধুই দীর্ঘশ্বাস!
আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় কেন বাগরি মার্কেটে যাবেন?
আমি নিশ্চিত আপনার উত্তর হবে ‘ছাড়’!

নতুন দোকান খুলছেন? কোথা থেকে সস্তায় আনবেন মালপত্র? সামনের সপ্তাহে অফিস শুরু, একটা ভালো ব্যাগ চাই? বাড়ি সাজাবেন? ওষুধ, সোনার গয়না, পোশাক, প্লাস্টিকের জিনিস, গিফট, খেলনা কি চাই?
বিপুল ছাড়ে মনের মতো শপিং করতে চাইলে আপনার একমাত্র ডেসটিনেশন বাগরি মার্কেট।

আর বাগরির বোনাস পয়েন্ট কি ছিল জানেন?
আপনি শপিং করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে, নিজের ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়ার ঝক্কি থেকেও মুক্তি দিত বাগরি। সেখানে সেই ব্যাবস্থাও ছিল। ‘মুটিয়া’রা ১৫০ টাকার বিনিময়ে লাঘব করত সেই সমস্যা। তারাও সারাদিনে ৫০০-৬০০ টাকা উপার্জন করত।

‘বেলুন গলি’
ফ্যামিলি পার্টি বা অফিস পার্টি, সাজাবেন কিভাবে? ঝামেলা সামলাতো কুলতলা স্ট্রিটের বেলুন গলি। আকাশ যেন ঢেকে থাকত লাল,নীল হরেক বেলুনে। পার্টি হ্যাট, রঙ্গিন প্লাস্টিক,গিফট,কার্টুন কার্ট আউট, ব্যানার সবই থাকত এই রঙ্গিন গলিতে।
জোকার বা ম্যাজিশিয়ন চান?
তাও মিলত এখানে।
বাগরির যেন ট্যাগলাইন ছিল,’ইসসে সস্তা কহি নেহি…’
ঘড়ি,সানগ্লাস,চশমা, স্যুটকেস, ট্র্যাভেল ব্যাগ, স্কুল ব্যাগ, হ্যান্ড ব্যাগ। রীতিমতো বড় ডিসকাউন্টে পাওয়া যেত ব্যান্ডেড হ্যান্ডব্যাগ। এর পাশাপাশি রাজমিস্ত্রি, পেন্টারদের দেখা যেত নিজেদের সরঞ্জাম নিয়ে বসে থাকতে।

‘ব্যাগ’ চাই ?
নানান ধরণের ব্যাগই শুধু নয় পাওয়া যেত ব্যাগ তৈরির নানান সরঞ্জাম। সস্তা অথচ ব্যান্ডেড ।
এর পাশাপাশি জুতো, বেড কভার ও নানান জিনিস তৈরির কাঁচামালের বিপুল সম্ভার থাকত এখানেই। একটি ব্যাগের জন্য মাত্র ১৪০ টাকায় পাওয়া যেত সেটি তৈরির সামগ্রী।
কোনো কোনও ব্যবসায়ী একেবারে বংশ পরম্পরায় ব্যাবসা করতেন এখানে,এমনকি পরিবারের সকলে যুক্ত থাকতেন একই কাজে।
নানান কারুকাজ করা ব্যাগ, জামার বোতামের জন্য বাগরি মার্কেটের চাহিদা ছিল তুঙ্গে। বেল্ট,রবার ব্যান্ড কি নেই? রঙ্গিন সুতো,প্লাস্টিক ও কাপড়ের ব্যাগ, সুগন্ধি পারফিউম থেকে সাবান সব কিছুর যেন খনি ছিল এই বাগরি মার্কেট।

‘পট্টি’
বাগরির অন্যতম পরিচয় ছিল প্লাস্টিক পট্টি হিসেবে।
‘সেলোটেপ’
আপনার কিরকমের সেলোটেপ চাই? ব্রাউন,ট্রান্সপারেন্ট,চকচকে, রঙ্গিন,ট্রেন্ডি, কারু-কাজকরা, আপনার নাম লেখা? সবই মিলত এখানে।
‘কনফেট্টি’
এখানে শুধু ন্যাপথলিন বল আর মেয়েদের সাজের অন্যতম উপাদান ‘বিন্দি’ পাওয়া যেত।
এর পাশাপাশি Avon, Amway, Oriflame প্রভৃতি ব্যান্ডেড প্রোডাক্টেও থাকত লোভনীয় ছাড়। ১৮-২০% ছাড়ে ওষুধ, রান্নাঘরের সামগ্রী ২৫% এরও বেশী ছাড়ে, পান-মশলা সবই ছিল লোভনীয় ছাড়ে।
সমস্যা এক্টাই গাড়ি নিয়ে গেলে তা রাখবেন কোথায় সে এক লাখ টাকার প্রশ্ন। এতটাই ভিড় আর দোকানে ঠাসা এই বাগরি বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যেত না এক জায়গায়। আর সেজন্যই বোধহয় ১৪ ঘণ্টা পেরোলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
অন্তত স্মৃতিটুকু থাক!

অনুলিখন: সুবর্ণা পাত্র