নেশার টাকা জোগাড়ে মা-বাবাকে রোজ মেরে ফেলছে ওরা

শংকর দাস, বালুরঘাট: পিতৃ মাতৃ দায় থেকে মুক্তি পেতে হিন্দু শাস্ত্রে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কথা আমরা সকলেই জানি। সেই জন্মদাতা পিতা ও জন্মদাত্রী মায়ের দায় মুক্তির অনুষ্ঠান বিশেষ করে সন্তানের জীবনে একবারই হয়ে থাকে।

কিন্তু বালুরঘাটের বেশ কিছু যুবক ও কিশোরের জীবনে সেই সৌভাগ্য একপ্রকার প্রতিদিনই ঘটছে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে কি দৈনিকই তাঁদের পিতা অথবা মা মারা যাচ্ছেন?

আরও পড়ুন: মারিজুয়ানায় আপত্তি নেই এই দেশে!

- Advertisement -

অনেকটা সেই রকমই অবস্থা। হিন্দু শাস্ত্র মতে পিতা মাতার বিয়োগে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সন্তানের জীবনে দুই বার আসলেও বালুরঘাটের ঘটনাটি একটু অন্যরকমই। এখানে মাদকের নেশার কষ্ট নামক দায় থেকে মুক্তি পেতে এক প্রকার দৈনিকই পিতা অথবা মাতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের নামে গুরুদশা পালন করতে হচ্ছে।

হ্যাঁ শুনে গল্প মনে হলেও এটাই সত্যি। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের উদাসীনতায় দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট শহর এখন হেরোইন ব্যবসায়ীদের স্বর্গ রাজ্যে পরিণত হয়েছে। শহরের কল্যাণী সিনেমা হল কলোনিতে প্রকাশ্যে হেরোইন বিক্রি চললেও পুলিশের তরফে কোনও ব্যবস্থায় নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ।

আরও পড়ুন: বন্ধুর স্ত্রীকে কটূক্তি করায় দুই যুবকের মধ্যে ধুন্ধুমার

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে হেরোইনের ব্যবসা করে একশ্রেণীর পরিবার আঙ্গুল ফুলে কলা গাছের অবস্থা হয়ে গিয়েছে। যুব সম্প্রদায়কে ধ্বংসকারী বেআইনি এই কারবারের মূল পান্ডাদের স্পর্শ পর্যন্ত করছে না প্রশাসন। ফলে সংস্কৃতির এই শহরে মাদকাসক্ত যুবক ও কিশোরের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শুধু যুবক বা কিশোররাই নন। মহিলারাও হেরোইনের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে মারাত্মক ও নবতম সংযোজন হল বেশ কিছু স্কুল পড়ুয়াও হেরোইনের নেশা করতে শুরু করেছে।

দিন দিন চাহিদা বেড়ে চলায় তাই হেরোইনের পুড়িয়ার দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ছোট্ট একটি পুড়িয়ার দাম একশো থেকে একশো দশ টাকা। কম করেও সারা দিনে তিনটি পুড়িয়া প্রয়োজন। পুড়িয়ার টাকা যোগাতে শহরে বেড়ে গিয়েছে সাইকেল ও অন্যান্য সামগ্রী চুরির সংখ্যা।

আরও পড়ুন: কন্যাসন্তান হওয়ায় গৃহবধূকে খুনের অভিযোগ শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে

আর যাঁরা চুরি করতে পারেন না, তাদের অধিকাংশ পুড়িয়ার টাকা জোগাতে অভিনব পন্থা অবলম্বন করেছেন। সকাল হতেই গুরুদশার সাদা পোশাক পরে পিতা অথবা মা মারা গিয়েছেন এই বাহানা করে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের নামে বাসে ট্রেনে ও রাস্তায় অর্থ তুলে বেড়াচ্ছেন। সারাদিনের পুড়িয়ার খরচ উঠে গেলেই গুরুদশার সেই সাদা কাপড় ছেড়ে সাধারণ পোশাকে চলা ফেরা করছেন।

এই ঘটনা শুধু এক দিনেরই নয়। দৈনিকই সকাল হলে হেরোইনের নেশায় বুঁদ অবস্থায় সাদা কাপড় পড়ে পিত মাতার শ্রাদ্ধের নামে টাকা তুলতে বেরিয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি টোটো চালকদের একাংশের মধ্যেও হেরোইনের নেশা ঢুকে পড়েছে। হেরোইন খেয়ে টোটো চালানোই শহরে বেড়ে গিয়েছে পথ দুর্ঘটনার সংখ্যাও।

আরও পড়ুন: ভারতীয় রেল শুরু করল আবেদনের প্রক্রিয়া

প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির তরফে এই বিষয়ে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় হেরোইন খোরদের অত্যাচার যেমন বেড়েই চলেছে। তেমনই বৃদ্ধি পাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ। কেউই হেরোইনের ব্যবসার বন্ধে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় অগত্যা পথে নেমেছে বালুরঘাটের চেতনা মঞ্চ নামে একটি নাগরিক সংগঠন। ইতিমধ্যেই শহরের জলযোগ মোড়, ট্যাংক মোর ও বাসস্ট্যান্ড মোরে ব্যানার দ্বারা হেরোইন সম্পর্কে মানুষ সচেতন করার কাজ শুরু করেছে এই মঞ্চ।

 

চেতনা মঞ্চের আহ্বায়ক জিষ্ণু নিয়োগী জানিয়েছেন, শহরের অবস্থা খুবই করুন। পুলিশ প্রশাসন হেরোইন কারবারিদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিদিনই বেড়ে যাচ্ছে এই নেশায় আসক্তদের সংখ্যা। পরিস্থিতি এমন যে বাড়িতে বাবা মা বেঁচে থাকা সত্বেও পুড়িয়ার খরচ জোগাতে অল্পবয়সি ছেলেরা তাঁদের শ্রাদ্ধশান্তির নামে রাস্তায় পয়সা তুলতেও পিছু পা হচ্ছেন না। শুধু প্রশাসনই নয় জেলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিও হেরোইন সেবনের কুফল সম্পর্কে ছাত্রছাত্রী বা যুবকদের সচেতন করার কোনও উদ্যোগই নিচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

আরও পড়ুন: লাইসেন্স ছাড়াই বিক্রি চলছে মরা ছাগলের মাংস

এদিকে দক্ষিণ দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবাশীষ নন্দী জানিয়েছেন, দৈনিকই মাদক বিরোধী অভিযান তাঁদের জারি রয়েছে। বিক্রেতাদের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এমনকি মঙ্গলবার বিশ্ব মাদক বিরোধী অভিযানের দিন সকাল থেকেই বালুরঘাট ও গঙ্গারামপুরসহ সমস্ত থানা এলাকায় সচেতনতা মূলক নানান অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে বলেও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দাবি করেছেন।

Advertisement
-----