মাহবুব রোকন, ঢাকা: ভারত থেকে শুরু করেছিলেন৷ তারপর ১৭ বছর কেটে গিয়েছে৷ অদম্য সাহসী বাংলাদেশি নাজমুন নাহার দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্তে নিজের পদচিহ্ন রেখে আপন হাতে নিজ দেশের পতাকা উড়াতে চান। তেমন এক দেশাত্মবোধের বিশেষ ‘কনসেপ্ট’ নিয়ে পৃথিবীর পথে ছুটছেন এই অপরাজেয় নারী। সড়ক পথে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়সাধ্য ভ্রমণ দিয়েই দেশাত্মবোধ প্রকাশের এমন জেদি নারী পরিব্রাজক দুনিয়ার মানুষ আগে আর দেখেনি।

১৭ বছর আগে ভারতের মাটি থেকেই বিশ্ব অভিযানের ধ্রুব যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর। ভারতের মাটিতেই প্রথম রূপিত হয়েছিল নাজমুন নাহারের বিশ্বজয়ের স্বপ্নবীজ। এই বাংলাদেশি নারীর নাম এখন মানুষের মুখে মুখে। www.kolkata24x7.com এর সাথে বিশেষ আলাপকালে তিনf জীবনের গল্প ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যাত্রার পটভূমি তুলে ধরেন। দেশটির নারী প্রগতিবাদীরাও তাঁর ভ্রমণ কনসেপ্টটিকে বেশ ভালো চোখে দেখছেন। নারীদের নিয়ে সমাজে প্রচল ট্যাবু ভাঙ্গার জন্য নাজমুন নাহারই সাক্ষাত নমুনা হতে পারেন বলে মনে করেন তারা।

নাজমুন বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন সাংবাদিক। চলতি মাসের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ড ভ্রমণ করছিলেন নাজমুন। এরই মধ্যে বহু দফায় আলাপ হয় তাঁর সাথে। লন্ডন ভ্রমণকালে বিবিসি, বেন টিভিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম তাঁর সাক্ষাতকার প্রচার করে। দুনিয়া জয়ের মিশনে থাকা এই নারী পরিব্রাজক বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার গিনি বিসাও’তে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি তিনি দেশটিতে পৌঁছান।

বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করা এই নারীর ভ্রমণের ধারণাটা যেন তার পারিবার থেকেই পাওয়া। দাদা (পিতামহ) আলহাজ্ব ফকীহ আহমদ উল্লাহ ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত আরবের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। এই সব ভ্রমণের গল্প শুনে, বই পড়ে -ছোটকাল থেকেই বিশ্ব ভ্রমণের বীজ মনের ভেতর লালন করে আসছিলেন তিনি। স্বপ্নকে প্রয়োগে উত্তীর্ণ করার জায়গায় তার বাবা ও পরিবারের ভূমিকাই ছিল প্রধান কারণ। পরিবার থেকে পেয়েছেন অসঙ্কোচ সহযোগিতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর ২০০৬ সালে শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে তিনি সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন! এছাড়াও তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া বিষয়ে স্কলারশিপ পেয়ে আলাদা ডিগ্রি অর্জন করেন। এরই মধ্যে কিছু সময় তিনি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত থেকে পরে এই পেশা হতে অবসর নেন।

বিশ্ব ভ্রমণের প্রথম দেশ হিসেবে ভারত সফর ছিল তাঁর প্রথম তালিকায়৷ ২০০০ সালে তিনি মধ্যপ্রদেশের পাঁচমারিতে যান। ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রামে অংশ নেন৷ কলকাতা ২৪x৭ কে তিনি ভারত ভ্রমণের স্মৃতিকথা বেশ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। ১১৪ টি দেশে ঘুরেছেন নাজমুন নাহার৷ । ২০১৮ সালের ১ জুন নাজমুন একশটি দেশ ভ্রমণের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে যান। এই ঐতিহাসিক ক্ষণে তিনি বাংলাদেশের পতাকা হাতে জাম্বিয়ার সীমান্তবর্তী লিভিংস্টোন শহরে অবস্থিত পৃথিবীর বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের ব্রিজের উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়েতে পৌঁছান। জলপ্রপাতটির অর্ধেক জাম্বিয়ায়, বাকি অর্ধেকটা জিম্বাবোয়ে-তে পড়ে।

নাজমুন জানান – ভ্রমণকালের বহু সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়িয়েই তিনি দেশ ভ্রমণের এই সেঞ্চুরি অর্জন করতে সক্ষম হন। রাতের অন্ধকারকে একাকার করে পর্বতে, সমুদ্রের তলদেশে, দুর্গম জঙ্গলে, বন্যপ্রাণীর পাহাড়ে, অজানা আদিবাসীদের এলাকায় গিয়েছেন৷

আফ্রিকার মৌরিতানিয়া ও সেনেগাল ঘোরাটা ছিল বেশ কঠিন-এমনই জানিয়েছেন নাজমুন৷ সাহারা মরুভূমি এডভেঞ্চারের সময় তাকে প্রচণ্ড ধুলো ঝড়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ওই সময় ঝড়ের তোড়ে তার চোখ ও নাকের মধ্যে মরুর তপ্ত ধারালো বালুকণা ঢুকে তিনি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। মুখেও আঘাত পান প্রচণ্ড ভাবে। এমন তপ্ত মরুর বুকের দাবদাহ তাকে দমিয়ে দিতে পারিনি। শেষতক তিনি মরু প্রান্তরের দীর্ঘ উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যালিতে উড়িয়েছেন দেশের পতাকা৷

পড়ুন: বাংলাদেশের মানুষের জন্যে বড়সড় সুবিধার কথা ঘোষণা করল চিন

নাজমুন নাহার জানান -আফ্রিকা মহাদেশের নর্থ আটলান্টিকের পাশ দিয়ে সাউথ আটলান্টিক পর্যন্ত সমুদ্রের
পাশ ঘেঁষে সকল দেশই রয়েছে তাঁর ভ্রমণ তালিকায়। এবারের যাত্রা শুরু করেছেন আফ্রিকার মৌরিতানিয়া থেকে। ভূ-পথ ব্যবহার করে সেনেগাল হয়ে গাম্বিয়া, মালি, গিনি বিসাও, সিয়েরালিওন, গিনি, লাইবেরিয়া, আইভোরিকোস্ট, ঘানা, টোগো, বেনিন, নাইজেরিয়া, নিগার, চাদ, ক্যামেরুন, ইকোয়েটরিয়াল গিনি, গ্যাবন, কঙ্গো, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া পর্যন্ত।

পৃথিবীর সব দুর্গম পথ মাড়িয়ে, মৃত্যুকে অতিক্রম করে, কখনো না খেয়ে, কখনো না ঘুমিয়ে, হাজার হাজার মাইল পথযাত্রা করে, তাঁবুর মধ্যে থেকে, বন্য প্রাণীর আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে, সমুদ্রের তলদেশের লবণাক্ত জল খেয়ে ছুটে চলেছেন বাংলাদেশি পরিব্রাজক নারী। জাম্বিয়া সরকারের গভর্নর হ্যারিয়েট কায়েনা কর্তৃক সে দেশের সরকারের গভর্নরের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে বিরল ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি।

পড়ুন: বাংলাদেশ প্রিমিয়র লিগে খেলবেন স্মিথ

নাজমুন জানান-দেশের পতাকা হাতে যখন আমি হাঁটি তখন আমার মনে হয় আমার সাথে আমার দেশ ও জাতি হাঁটছে। এই সময় নিজকে কোনও ভাবেই একা মনে হয় না। বঙ্গবন্ধু শেখ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তিনি বলেন, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন পতাকা পেয়েছি তাঁদের প্রতি অপার শ্রদ্ধা প্রকাশ করতেই আমার এই বিশ্বযাত্রা।

এক রকমের ধর্মীয় রক্ষণশীলতার জায়গা থেকে মুসলিম দেশগুলোতে এখনও নারীদের নানা সীমাবদ্ধতার ফ্রেমে ধরে রাখা হয়। বাংলাদেশের মতো সংখ্যাগুরু মুসলিম রাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নাজমুন মুসলমান নারী কোনও ভাবেই সংকীর্ণতার খোড়লে নিজকে আটকে রাখতে নারাজ। তাঁর বিশ্বাস -তার মতো নারীদের দেখেই তরুণ এ প্রজন্মের তরুণ নারীদের ভেতর লুকিয়ে থাকা জড়তার ট্যাবুগুলো ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করেছে।

পড়ুন: এমনই অত্যাধুনিক ট্রেন চলবে এবার বাংলাদেশে!

নাজমুন নাহারের এই বিশ্ব পরিভ্রমণকে বাংলাদেশের নারীরা কিভাবে দেখছেন -সেটা জানার চেষ্টা করেছি আমরা। তাসলিমা আক্তার, দেশটিতে নারী অধিকার ও প্রগতি আন্দোলনের সাথে যুক্ত একজন। কলকাতা২৪x৭ কে তিনি জানাচ্ছিলেন -একজন মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে -সর্বোপরি একজন বাঙালি নারী হিসেবে নাজমুন নাহারের বিরল অভিযান বাংলাদেশের নারী সমাজ বা সমগ্র বাংলাবাসীর জন্য এক সুখকর ও গৌরবের বিষয়।

আসলে ইসলাম ধর্ম নারীকে গৃহঘেরা থাকবার কথা বলেনি, এ ধর্মের বিধানেও -জ্ঞান লাভের জন্য প্রয়োজনে চিন দেশে যাওয়ার কথা বলা আছে। তাই ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে প্রতিবন্ধকতা দিয়ে মূল্যায়ন করবার সুযোগ নেই। নাজমুন এই শিক্ষা ও সুযোগটি তার পরিবার থেকেই পেয়েছেন।

পড়ুন: বাংলাদেশ নির্বাচনে লড়াই করা হচ্ছে না খালেদা জিয়া

রাষ্ট্রসংঘের স্বীকৃতি রয়েছে পৃথিবীতে এমন দেশের সংখ্যা ১৯৩টি । এই সংখ্যার বাইরেও দুনিয়ায় আরও একাধিক দেশের অস্তিত্ব রয়েছে – সে সব দেশেও যেতে চান নাজমুন নাহার। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা পরিদর্শনের ইচ্ছা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সতেরো বছর আগে ভারত থেকেই পৃথিবীর পথে তাঁর প্রথম এ স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল মর্মে নানা স্মৃতিচারণ করেন নাজমুন নাহার। সে ভারতেই জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম কলকাতা২৪/৭ বিষয়টি নিয়ে তার সাথে আলাপে অংশ নেওয়ায় তিনি প্রতি ধন্যবাদ জানান।