বিশেষ প্রতিবেদন: নব্বই পেরিয়ে গিয়েও আন্দোলন থামাতে চাননি৷ একটু ভুল হল- আসলে তিনি বই পড়ানোর কাজ থেকে থেমে থাকতে চাননি৷ তবে তাঁকে থামতেই হল৷ আর সন্তানসম বই কোলে নিয়ে কাউকে বই পড়তে অনুরোধ করবেন না পালান সরকার৷ প্রয়াত হয়েছেন তিনি৷ তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া৷ সবাইকে বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে গ্রামে গ্রামে নিজের টাকায় বই বিলি করে অভিনব এক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তিনি৷

শুক্রবার দুপুরে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামে নিজের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়৷ পিতার মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে দেন পালান সরকারের পুত্র হায়দার আলি৷ ৯৮ বছর বয়সী পালান সরকার বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। গত এক সপ্তাহ ধরেই বেশ অসুস্থ ছিলেন। ১৯২১ সালে নাটোরে জন্ম নেওয়া পলান সরকারের আসল নাম হারেজউদ্দিন। তবে স্থানীয়দের কাছে তিনি পলান সরকার নামেই পরিচিত ছিলেন।

পিতার মৃত্যুর পরে আর্থিক অনটনে পড়া হারেজউদ্দিন কিন্তু বই পড়ার নেশা কাটাতে পারেননি৷ অনটনকে সঙ্গী করেই চালিয়ে গিয়েছিলেন পড়া৷ রোজগারের জন্য যাত্রাদলে অভিনয় করতেন৷ হয়েছিল কৌতুক অভিনেতা৷ তারই মাঝে চলত বিভিন্ন বিষয়ে বই পড়া৷ পরে তীব্র ঝঞ্ঝাময় সময়৷ পাকিস্তান আমলে উত্তাল গণ আন্দোলনের ষাটের দশক৷ পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথে-রাস্তায় চলছে সেনা শাসন ও সরকার বিরোধী আন্দোলন৷ পালান সরকার এসবের মাঝেও বইকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন৷ জমিয়েছেন বিভিন্ন বিষয়ের রকমারি বই৷ সেই সময়েই তিনি কিছু সম্পত্তির ভাগ পান৷ নিজেরই এলাকা রাজশাহীর বাউসাতে তাঁর দেওয়া জমিতেই ১৯৬৫ সালে হারুন অর রসিদ শাহ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়৷

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর হারেজউদ্দিন বই পড়া আন্দোলন চালিয়ে যান৷ পড়ুয়াদের বই উপহার দেওয়ার নিয়ম চালু করেন৷ আগ্রহ বাড়ছে দেখে বই পড়ানোকে জনমুখী আন্দোলনে পরিণত করেন৷ বয়স বাড়ছিল তার সঙ্গে বাড়ছি তাঁর বই বিতরণ করা৷ গ্রাম থেকে গ্রাম তিনি হেঁটে বই বিতরণ করে গিয়েছেন দশকের পর দশক৷

অভিনব এই উদ্যোগে বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বই পড়া আন্দোলন৷ বাড়তে থাকে পাঠকের সংখ্যা৷ সমাজ সেবায় অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। কখন যে হারেজউদ্দিন থেকে পালান সরকার নাম হয়ে গিয়েছে তা কেউই জানে না৷ বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পালান সরকার জানিয়েছিলেন, যতদিন হাঁটতে পারব, ততদিন বই পড়াব৷

তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে শেষ হল একটি অধ্যায়৷ বই পড়ানোর চেষ্টা করে গিয়েছেন জীবনভর৷ বই-ই আসল বন্ধু শিখিয়ে গিয়েছেন৷ স্ত্রী রাহেলা বেগম গতবছর মারা যান। এই দম্পতির ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে৷