দিকশূন্যপুরের এক প্রান্তে রয়েছে এই শহর !

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : দোষে গুনেই তৈরি হয় মানুষ। মানুষ নিয়েই তৈরি হয় একটা সমাজ, একটা শহর। তাই উত্তর ২৪ পরগণার এই শহরেও বর্তমান এই গুণ। দেব ভক্তি ও সমাজ বিরোধিতা এখানে পায়ে পা মিলিয়ে চলেছে। ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমান,সেই প্রবাহ চলছে একইরকম ভাবে। সেই প্রবাহেই বয়ে চলেছে মানুষ, বয়ে চলছে শহর সংলগ্ন গঙ্গা। সঙ্গী বহু চরিত্র, ভিন্ন মুখ এবং বিতর্ক।

barahanagar-02

বরাহনগর মানেই প্রথম বিষয় হল কালীমন্দির। শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে সে সব মন্দিরের কল্প কথা এবং কিছু সত্য ইতিহাস। এগুলির মধ্যেই অন্যতম হল সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির,  ব্রহ্মময়ী কালী মন্দির , জয় নারায়ন মিত্তির বাড়ির কালীমন্দির। এই তিন মন্দির জুড়ে রয়েছে ভক্তির কাহিনী।  জড়িয়ে রয়েছে পরমহংস রামকৃষ্ণ দেবের নাম।শোনা যায় দক্ষিণেশ্বর থেকে পূজা সেরে এইসব মন্দির গুলিতে প্রত্যহ ঢুঁ মেরে যেতেন তিনি। সঙ্গে রয়েছে আরও কিসসা কাহিনী যা শুনলে  মনে আধ্যাত্মিক ভাব আসতে বাধ্য।

barahanagar-03

তবে এই শহরেই রয়েছে আরও দুই মন্দির যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ডাকাতদের নাম। এক রঘু ডাকাত দুই চিতে ডাকাত। সম্ভবত রঘু ডাকাতের কলঙ্ক মুছতে বামনদেব মহাশয় সেই স্থলেই প্রতিষ্ঠা করেন কৃপাময়ীকে। আবার চিতে ডাকাত ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মানব বলি দিত। একবার তাঁর পথে পড়ে গিয়েছিলেন চিনা পরিব্রাজক হিউ এন সাং। মা চণ্ডীর দয়ায় হঠাৎ প্রকৃতি রুদ্র মূর্তি ধারন করে। সে যাত্রায় বেঁচে যান তিনি। প্রকৃতি ভাগ্যিস চিনেছিল চিনা পরিব্রাজককে। না হলে এ মহাভারতের ইতিহাসটা হয়তো অপূর্ণ থেকে যেত।

barahanagar

ডাকাত রামকৃষ্ণ দেব পেড়িয়ে পা রাখা যাক সদ্য ইতিহাস হওয়া বাস্তবের জমিতে। এখানেও সেই একই প্রবাহ বইছে। বরাহনগর শহরই ছিল একসময় নক্সালদের আখরা, বলে বলে লাশ পড়ত শহরে। ষাটের দশকে শেষের দিকে সত্তরের শেষের দিকের প্রায় খণ্ডযুদ্ধ লেগে থাকতো কংগ্রেস, সিপিএম ও নক্সালদের মধ্যে। ঘটনায় প্রান হারান বহু  মানুষ। নির্বাচনে রিগিংয়ের জেরে ভয়ে নামই তুলে নিয়েছিলেন জ্যোতি বসুর মতো বাম নেতা।

আবার উল্টো পারে বর্তমানের জমিতে তৈরি হয়েছে লৌকিক , অলৌকিকের দ্বন্দ। বহু ইতিহাসের সঙ্গী জয় নারায়ন মিত্তিরের মন্দিরটি এখন চলে গিয়েছে এক হাত কাটা প্রমোটারের দখলে। ঘটনা হল চুক্তি অনুযায়ী মিত্তির পরিবার মন্দিরের পাশের জমি বেচে দিয়ে একটি এগ্রিমেন্ট করে। সেখানে তারা মন্দিরকে নতুন ভাবে সাজিয়ে নিয়ে পাশেই ফ্ল্যাট করবার চুক্তি করেন। শুরু হয় কাজ, তৈরি হয়ে যায় অনিন্দ্য সুন্দর মন্দির। এখন মন্দির চত্বর দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কিন্তু ফ্ল্যাটবাড়ি ? আজ প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল ফ্ল্যাটবাড়িতে উঠেছে খালি খান চারেক দেওয়াল, বাকি পুরোটাই হাওয়া মহল। কি বলবেন এমন ঘটনাকে? অতএব আধ্যাত্মিক ও সমাবিরোধ এখনও বইছে সমান তালে।

barahanagar-01

পাশাপাশি এখানেই রয়েছে ওলন্দাজদের প্রথম কলোনি। ব্যবসার জন্য গঙ্গাপাড়ের এই এলাকাকেই বেছে নিয়েছিল তারা। বর্তমানে সেই জমিকে নিয়েও চলছে ঝামেলা। জমি হস্তান্তর হয়ে এক্তরফ থেকে অন্য হাতে গিয়েছে কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। জরাজীর্ণ এলাকা এখন নিজেই শুনছে তার গল্প।

আপাত দৃষ্টিতে বরাহনগর অত্যন্ত সাধারণ। আর পাঁচটা জায়গার মতোই রোজ সূর্য ওঠে এখানে। মানুষ কাজে যায়, পায়ের ঘাম মাথায় করে খাটে। কিন্তু আপাত সাধারনের গভীরে গেলেই পাওয়া যায় এক অন্য কাহিনী। যা একইসঙ্গে মনে জাগায় ভালোবাসা ও মন্দবাসা। আবার গল্প কথায় গায়ে জাগে শিহরন। সুনীলের দিকশূন্যপুরের কোন অংশ এমন হলেও খারাপ হতো কি?

 

 

 

Advertisement
----
-----