স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ জেলায় জেলায় অবৈধ বালি খাদান নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন তিনি৷ বিভিন্ন প্রশাসনিক বৈঠকে গিয়ে এই প্রসঙ্গে তাঁর ধমক শুনতে হয়েছিল জেলার উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্তাদের৷ এমনকী অবৈধ বালি খাদান চলার পিছনে যে বিজেপির হাত রয়েছে, তাও নাম না করে পরোক্ষে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি৷

কেন অবৈধ বালি খাদান বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসকের কাছ থেকে কৈফিয়তও তলব করেন মুখ্যমন্ত্রী। ২৯ নভেম্বর দুর্গাপুরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জেলার সীমানায় সিসিটিভি, ওয়াচ টাওয়ার করে নজরদারি চালানোরও নির্দেশ দিয়েছেন। কার্যত, মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া নির্দেশে নড়েচড়ে বসেছে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনও।

বুধবার বর্ধমান উন্নয়ন পর্ষদের সভাঘরে আয়োজিত বৈঠকে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ কর্তাদের নিয়ে চোলাই মদ এবং অবৈধ বালি খাদান নিয়ে রীতিমত কড়া নির্দেশিকা জারি করা হল৷ জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন, যে কোনো মূল্যেই তাঁরা এই অবৈধ কারবারকে বন্ধ করতে চান৷ সেজন্য জেলা প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি এদিন বৈঠকে প্রতিটি ব্লকেও ব্লকেও কমিটি গড়ে দেওয়া হয়েছে।

জেলাশাসক জানিয়েছেন, পূর্ব বর্ধমান জেলায় এখনও পর্যন্ত ই-টেণ্ডারের মাধ্যমে ৪৩০টি জায়গায় বালি তোলার ইজারা দেওয়া হয়েছে। তার বাইরে অন্য কোনো জায়গা থেকে বালি তোলা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে, অবৈধ বালি খাদান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর মঙ্গলবার জামালপুরে অভিযানে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন প্রশাসনিক আধিকারিকরা। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ৫জনকে গ্রেফতার করেছে।

আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে বিডিওর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট ব্লকে কতগুলি বালি খাদান চলছে সে বিষয়ে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে যাঁরা এই কারবারে জড়িত তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বালি পাচার চলছে? এলাকার গাড়ি চালকদের অভিযোগ, তাঁরাও চান নিয়ম মেনেই বালি লোড করে নিয়ে যেতে। কিন্তু বৈধ ভাবে বালি নিয়ে গেলেও তাঁদের পুলিশকে টাকা দিতে হচ্ছেই। না দিলে মিথ্যা অভিযোগে তাদের গাড়ি আটকে, কাগজপত্র সিজ করে তাদের জেলে ভরে দেওয়া হচ্ছে।

গাড়ি চালকদের অভিযোগ, প্রতিটি থানায় চালু করা হয়েছে বিশেষ কার্ড। মাসে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে এই কার্ড নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন বালির ওভারলোডিং করতে৷ গাড়ি চালকরা জানিয়েছেন, বৈধভাবে চালান কেটে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবার পথে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকছেন সেই সেই এলাকার পুলিশ কর্মীরা। বালি বোঝাই গাড়ি গেলেই তাতে তাদের সমস্তরকম বৈধ কাগজপত্র থাকলেও জোর করে তাঁদের থেকে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা দিতেই হচ্ছে। এভাবে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর মাঝে যতগুলি থানা এলাকা পড়ছে তাঁরাই টাকা আদায় করছেন।

গাড়ি চালকদের অভিযোগ, থানা থেকে যে কার্ড চালু রয়েছে তাতে একমাসের বৈধতা থাকছে। কোনও কারণে নির্দিষ্ট সময়ে সেই কার্ড রিনিউ করতে না পারলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। আর তা না দিলেও জেল হাজত হয়রানি আর দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে বাধ্য হয়েই এই অতিরিক্ত অর্থ দিতে গিয়ে তাঁদের ওভারলোডিং করতে হচ্ছে৷

উল্লেখ্য, গত নভেম্বর মাসেই প্রায় ১৬০ জনকে পুলিশ অবৈধ বালি পাচারের দায়ে গ্রেফতার করেছে৷ একই সঙ্গে প্রায় ২ কোটি টাকা জরিমানা বাবদ রাজস্বও আদায় হয়েছে। এদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ সত্ত্বেও কিভাবে চলছে অবৈধ বালি কারবার তা নিয়ে খোদ লরী চালকরাই অভিযোগ করেছেন, কার্যত পুলিশী ইচ্ছায় দেদার চলছে অবৈধ বালি পাচার।

যদিও এব‌্যাপারে এদিন জেলাশাসক জানিয়েছেন, পুলিশ কার্ড চালু করে টাকা নিচ্ছে এরকম কোনও অভিযোগ তাঁদের কাছে আসেনি। এরকম কোনও অভিযোগ এলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, এই অভিযান চলবে যথাযথভাবে৷

--
----
--