বড়দিনে পুরনো আতরের মতো মন কাড়ে বড়ুয়া কেক

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: কিংবদন্তি অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়ার নামই তখন কেউ শোনেননি৷ তার অনেক আগে আরও এক বড়ুয়া ঢুকে পড়েছিলেন বাংলার ঘরে ঘরে৷ বড়দিন এলেই তাঁর কথা কেউ কেউ মনে করেন৷ জিভে জল এসে যায় যে…

১৯১৪ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল বড়ুয়া বেকারির। শতবর্ষ পেরিয়ে বাঙালির অনেক কিছু খুইয়ে ফেলার মতোই শেষের পথে বড়ুয়াদের সেই কেক নস্ট্যালজিয়া। উপনিবেশ ভারতের কেক ইতিহাসে ধরা আছে সেই কথা৷

মহানগরের বিখ্যাত ধর্মতলা৷ আরও বিখ্যাত টিপু সুলতান মসজিদ পাশ দিয়ে এস এন ব্যানার্জি রোডে দেখা মিলবে বড়ুয়া বেকারির। বড়দিনে মাতোয়ারা কলকাত৷ কিন্তু বড়ুয়া বেকারি থেকে আর কেকের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে না। এখানে শোনা যায় কেবল কারখানার লোহার গন্ধ।

- Advertisement -

কোনও শো-রুম নেই, কোনও সাজগোজ নেই, জীর্ণ অবস্থাতেই এগিয়ে চলেছে শতাব্দী প্রাচীন বড়ুয়া বেকারি। বড়দিনের কেকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মহানগরের ইহুদি সম্প্রদায়৷ সংখ্যায় কমে এলেও এখনও কেকের বাজারে বেশ জনপ্রিয় নাহুমস৷

আবার স্বাছন্দ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন মুসলিম পরিবার। ইম্পেরিয়াল বা মল্লিক’স সেরকম কিছুই বলে। এরকমই বিখ্যাত কেক বিক্রেতাদের টেক্কা দিয়েছিল মনোরঞ্জন বড়ুয়ার ‘বড়ুয়া’-কেক।

আরও পড়ুন- গির্জা থেকেই ‘চুরি’ হচ্ছে প্রাচীন বাইবেলের পাতা

১৯১৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে এসে মোরব্বা, কিসমিস, টুটিফুটি নিয়ে মধ্য কলকাতায় কেকের ব্যবসা শুরু করেছিলেন মনোরঞ্জনবাবু। শুরুতে ব্যবসা চালাতে প্রচুর ধাক্কা লেগেছিল৷ সময়ের সঙ্গে কেটে যায় সমস্ত ঝড়-ঝাপটা। শহরের সমস্ত বড় কেক প্রস্তুতকর্তাদের টেক্কা দিয়ে দৌড়তে শুরু করেছিল চাটগাঁয়ের যুবকের ব্যবসা।

সেই বড়ুয়া পরিবারের বর্তমান সদস্য অসীম বড়ুয়া জানিয়েছেন, “পরিবারে অনেক অভাব ছিল। শূন্য থেকেই শুরু হয়েছিল ব্যবসা।” সঙ্গে ছিল নাহুমস, ফিরপো-র মতো বড় বড় সংস্থার সঙ্গে মার্কেট ধরার লড়াই। অসীম বড়ুয়া বলেন, “ধীরে ধীরে আমাদের তৈরি করা কেক ভালো লাগতে শুরু করে গ্রাহকদের।আমাদের স্পেশালিটি কোনোদিনই কিছু ছিল না।”

তাহলে বিক্রির এক্স ফ্যাক্টরটা কোথায় ছিল? অসীমবাবুর কথায়, “বাঙালির হাতের তৈরি কেক। স্বাদটাই মনে হয়ে জিভে লেগে গিয়েছিল কলকাতাবাসীদের।” সেটাই ‘বড়ুয়া’ কেক-কে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে।

এতদিনের ব্যবসার এই অবস্থা কেন? অসীমবাবু স্পষ্ট বক্তা। জানালেন, “ছেলেরা কেউ আর ব্যবসায় মন দেয় না। সবাই ব্যস্ত নিজের নিয়ে। কেউ চাকরি করছে। নিজস্ব ব্যবসা খুলেও নিয়েছে অনেকে। এই বয়সে এসে আমরা বুড়োরা নতুন করে কিছু করবার তাগিদ পাই না। যেভাবে মানুষের ভালোবাসায় এগিয়ে চলেছে সেটুকুতেই খুশি পরিবার। “

মহানগরের ঘরে ঘরে তখন ‘বড়ুয়া’ টিফিন কেকের রমরমা৷ ভাবনা ছিল বাঙালির ঘরের প্রত্যেকদিন জায়গা করে নেওয়ার। ভালোই এগোচ্ছিল কাজ। কিন্তু টিফিন কেকের আসল কারিগর মারা যাওয়ার পর ধাক্কা খায় প্রতিষ্ঠানটি৷

বংশ পরম্পরায় বড়ুয়াদের তৈরি ফ্রুট কেকের সোয়াদ ভুলতে পারছে না কলকাতাবাসী৷ সেই টানেই অনেকে হাজির হন বড়ুয়া কেক কাউন্টারে। বড়দিনের কেক মানে তাঁদের কাছে শুধুই স্পেশাল পাম কেক, এবং সুরুচি। যা ধরে রাখতে চাইছে শতাব্দী প্রাচীন কেক তৈরির প্রতিষ্ঠানটি৷

বড়দিনের কেকের গরম বাজারে ঘরে কেক ঢুকবে না, এটা হতেই পারে না৷ পাঁচতারা থেকে পাড়ার দোকান , নানা দামের , নানা রকমের কেক পসরা দেখা যায়৷

এসবের মাঝে ধীরে ধীরে আরও ফিকে হয়ে যাচ্ছে বাঙালির কেক নস্ট্যালজিয়া ‘বড়ুয়া’ কেক। ফুরিয়ে যাচ্ছে বাঙালির ব্যবসা করে নাম কেনার ‘গপ্পো’।

Advertisement ---
---
-----