শহরে ১১৭ বছরের আগে-পরের দুষ্প্রাপ্য ইতিহাস বিপন্ন

স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: সভ্যতার বিবরণের সাক্ষী আজ স্বয়ং বিপন্নের মুখে৷ বাইরের চেহারাটা দেখলে মনেই হবে না দেখতে দেখতে কাটিয়ে ফেলেছে ১১৮টি বসন্ত৷ বয়স হয়েছে, কিন্তু তার থেকে বেশি বয়সের সাক্ষী রয়েছে তার কাছে৷ ১৯০৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসের হাত ধরেই তার জন্ম৷

ভারত তথা এশিয়ার বৃহত্তম গ্রন্থাগার ন্যাশনাল লাইব্রেরি৷ যেখানে দুষ্প্রাপ্য ইতিহাস এখনও খুঁজে পাওয়া যায়৷ তবে বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তাতে আগামী প্রজম্মের হাতে সে সব তুলে দেওয়া সম্ভব কি না, তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হিসাবে দেখা দিয়েছে৷ প্রযুক্তির হাত ধরে চাঁদ ও মঙ্গলে যখন পা বাড়িয়েছে মানুষ, সেই প্রযুক্তির আলো দূর অস্ত৷ নেই দুষ্প্রাপ্য বই, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্রের রক্ষণাবেক্ষণের প্রহরী অর্থাৎ, লাইব্রেরিয়ান৷

- Advertisement -

দেশ-বিদেশ থেকে ছাত্র-ছাত্রী, গবেষক আসেন এই ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতে৷ তাঁদের হাতে সঠিক পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়ার জন্য যে বা যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের অস্তিত্ব এখন মহাসংকটে৷ আর, তাই দুষ্প্রাপ্য সমস্ত বই শুধু নয়৷ ম্যাগাজিন, সংবাদপত্রগুলি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে৷ লাইব্রেরির ভিতরে ঘুরতে ঘুরতে দেখা হল হাওড়া সালকিয়ার বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ ঘোষের সঙ্গে৷ তিনি ১৯৬৫ সালের শ্রমিক ধর্মঘটের বিষয়টি জানতে চাইছিলেন৷ সেই সময় আন্দোলন কেমন ছিল৷

একটি পুরোনো সংবাদপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি৷ কিন্তু আগামী প্রজন্ম হয়তো আর এই দুষ্প্রাপ্য তথ্য খুঁজেই পাবেন না৷ কারণ, একটাই, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে জাতীয় গ্রন্থাগারে সংগৃহীত শতাধিক বছরের পুরোনো দুষ্প্রাপ্য সংবাদপত্র৷ ভাষা ভবনের সংবাদপত্র সংগ্রহশালার প্রতিটি রেকে থরে-থরে সাজানো দুষ্প্রাপ্য সংবাদপত্র৷ যার মধ্যে রয়েছে অমৃতবাজার পত্রিকা থেকে শুরু করে যুগান্তর, স্বাধীনতা, স্টেটসম্যান সহ শতাধিক বছরের পুরোনো ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে মোট ১৭টি দৈনিক পত্রিকা-র সংস্করণ৷

এ সবের প্রকাশকাল ১৮ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত৷ প্রায় শত বছরের পুরোনো কাগজ সংগৃহীত করা হয়েছে৷ কর্মীদের অভিযোগ, সংবাদপত্র রাখার রেকগুলো প্রয়জনের তুলনায় অর্ধেক৷ ফলে, সংবাদপত্রগুলোর ধারগুলো রেক থেকে বেরিয়ে ঝুলে থাকার জন্য নষ্ট হয়ে পড়েছে৷ গ্রন্থাগারের একাংশ কর্মী এই নিয়ে সরব থাকলেও হেলদোল নেই কতৃর্পক্ষের৷ একাধিক বার চিঠিচাপাটি চালিয়েও কোনও সুরাহা হয়েনি বলে অভিয়োগ ন্যাশনাল লাইব্রেরি স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শৈবাল চক্রবর্তীর৷

তাঁর এমনও অভিযোগ, ২০১৩ সালে এসপ্ল্যানেড ইস্টের দফতর থেকে সংবাদপত্রগুলো ভাষা ভবনে স্থানান্তরিত করার পিছনে দুষ্প্রাপ্য দলিলগুলো বাঁচানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, এখানে নিয়ে এসে সেই উদ্যোগ সফল হয়েনি৷ কারণ, ওই দফতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র ছিল না৷ তাই প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা না পাওয়ার ফলে দ্রুত নষ্ট হচ্ছিল কাগজগুলো৷ এখানে আনার পরও প্রয়োজনীয় তাপমাত্রার মধ্যে রাখা হয়নি৷ তা ছাড়া রেকগুলো অর্ধেক আয়তনের হওয়ায় কাগজগুলো রেক ছাড়িয়ে বেরিয়ে ঝুলছে৷ ফলে নষ্ট হচ্ছে কাগজের কোণা৷ একাধিকবার কতৃর্পক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কোনও ফল হয়েনি৷

Advertisement
---