দেবযানী সরকার, কলকাতা: দলের সঙ্গে মান-অভিমানের পালা মিটিয়ে পঞ্চায়েত ভোটে মাঠে নামছেন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়৷ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি সপ্তাহ থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগণার জেলা সভাপতি হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করবেন তিনি৷ শোভন চট্টোপাধ্যায়ের এই কাম-ব্যাক দলের অনেকেরই অস্বস্তি বাড়াল বলে মনে করছে তৃণমূলেরই একাংশ৷

খাতার কলমে তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগণার জেলা সভাপতি৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও তৃণমূল ভবনে ভোট সংক্রাম্ত বৈঠকে ডাক পাননি৷ তাঁর ঠাঁই হয়নি পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে জেলায় গঠিত স্টিয়ারিং কমিটিতে৷ পঞ্চায়েত ভোটের ময়দান থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয় কানন যখন ‘ভ্যানিশ’ হয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক সেইসময়ই তাঁর কাম-ব্যাক হল৷

Advertisement

সূত্রের খবর, দলের সভাপতি সুব্রত বক্সীর নির্দেশে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ভোটের কাজে নামছেন তিনি৷ জানা গিয়েছে, চলতি সপ্তাহ থেকে শোভন চট্টোপাধ্যায় তৃণমূল ভবনেও বসবেন৷ যদিও এব্যাপারে জানার জন্য ফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন কেটে দিয়েছেন৷

বেশ কিছুদিন ধরে দলীয় কর্মসূচী থেকে পুরসভার একাধিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি শোভন চট্টোপাধ্যায়কে৷ এমনকি পুরসভাতেও তিনি নিয়মিত আসতেন না বলে অভিযোগ৷ সেইভাবে সইও করতেন না ফাইলে৷ কিন্তু শনিবার গার্ডেনরিচে পাম্পিং স্টেশনের পাইপ ফেটে যাওয়ার পর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করেন মেয়র৷ এমনকি সোমবার দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রশাসনিক বৈঠকেও নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যান৷ সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথাও হও৷ গত চার-পাঁচদিনে দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে৷

স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে বিতর্কে জড়িয়েছেন মেয়র-মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়৷ সম্প্রতি প্রকাশ্যে ‘কাছের বন্ধু’ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সেই বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি নিজেই৷ তাঁর এই আচরণে অসন্তুষ্ট হয় দল৷ কিন্তু তাতে কান না দিয়ে বরং আরও গা- ছাড়া মনোভাব দেখাচ্ছিলেন শোভন৷

তৃণমূল সূত্রের খবর, অনেকদিন ধরেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শোভনকে ‘কাজে মন দেওয়ার’ নির্দেশ দিচ্ছিলেন৷ দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকবার নিজে ফোন করে তাঁকে ‘শোধরানো’র নির্দেশ দেন৷ গা ঝাড়া দিয়ে ভোটে কাজ করার কথা বলেন৷

বিশেষ সূত্রের খবর, সে কথায় কান না দিয়ে শোভন চট্টোপাধ্যায় দলকে পাল্টা শর্ত দেন৷ বলেন, সংবাদমাধ্যমের কাছে দলকে জানাতে হবে দল তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপারের মধ্যে নেই৷ দল সেটা মানলে তবেই তিনি ভোটের কাজ করবেন৷ কিন্তু দল তাতে রাজি ছিল না৷ বরং শোভনের শর্তে বিরক্ত হয়ে তাঁকে পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে তৃণমূল ভবনের বৈঠকে ডাকা হয়নি৷

সেই বৈঠকে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ (সেইসময় প্রার্থী ছিলেন) শুভাশিস চক্রবর্তী, অঞ্জন দাস, শক্তি মন্ডল ও আবু তাহেরকে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় ভোটের দায়িত্ব দেয় দল৷ এরমধ্যে শুভাশিস চক্রবর্তীকে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রতীক বন্টনের৷

শোভন চট্টোপাধ্যায় ভোটে পুরোদমে মাঠে নামলে শুভাশিস চক্রবর্তীর হাতে সেই দায়িত্ব থাকবে কিনা তা নিয়ে দলের অন্দরেই কৌতুহল চরমে৷ কারণ এতদিন জেলার সভাপতি হিসেবে শোভন চট্টোপাধ্যায়ই এই কাজ করে এসেছেন৷ এবার কাজ শুরু করার পরও শোভন চট্টোপাধ্যায়ের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিলে তাঁর তো বটেই, সঙ্গে শোভন ঘনিষ্টদেরও মন ভেঙে যেতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷ যার প্রভাব পড়তে পারে ভোটে৷

শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ভোটের ময়দানে ফিরে আসায় দলের অনেকেরই অস্বস্তি বাড়ালো বলে তৃণমূলের একাংশ মনে করছে৷ বিশেষ করে তাঁর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে যাঁরা ভোটের দায়িত্ব পেয়েছিল তাদের কিছুটা অসুবিধে হল বলেই মনে করা হচ্ছে৷

পঞ্চায়েত ভোট মিটলেই শোভন চট্টাপাধ্যায়কে জেলা সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় শুভাশিস চক্রবর্তীকে নিয়ে আসার কথা৷ যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও তা ঘোষণা হয়নি৷ তবে পঞ্চায়েতে শোভন চট্টোপাধ্যায় ভাল পারফর্ম করলে দলের সেই সিদ্ধান্ত বদলায় কিনা তা অবশ্য সময় বলবে৷ তবে, আপাততঃ ভোট যুদ্ধে কামব্যাক করে দলে নতুন যুদ্ধের সূচনা করলেন শোভন।

----
--