প্রয়াত অটলবিহারীকে নিয়ে নোংরামোর সমালোচনায় বাংলার বুদ্ধিজীবীরা

শেখর দুবে, কলকাতা: মানুষের জীবনের সঙ্গে রাজনীতি শব্দটি জুড়ে গেলেই প্রশংসা এবং সমালোচনা দুটোরই ভাগীদার হন তিনি। আর যদি তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন তাহলে তো অবশ্যই তাঁকে সম্মানের পাশাপাশি শক্ত বিরোধিতার জন্যও তৈরি থাকতে হয়। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য কতটা সমীচীন? এই প্রশ্নই Kolkata24x7-এর পক্ষ থেকে রাখা হয় বাংলার সেই সমস্ত মানুষদের কাছে যাঁরা শিল্প, সাহিত্যে বাংলার কীর্তি বাড়িয়েছেন। কী বলছেন তাঁরা?

কবি সুবোধ সরকার: “সোশ্যাল মিডিয়াতে বিশেষ করে ফেসবুকে যে ধরণের কুরুচিকর মন্তব্য দেখতে পেলাম। তাতে অবাক হয়ে যাচ্ছি বাঙালির নতুন প্রজন্মের মননের অধঃপতন দেখে। রাজনীতি, রাজনীতির জায়গায় থাক। মানুষের মৃত্যু হলে একটা স্বাভাবিক সৌজন্য আশা করা হয়। সেই সৌজন্যবোধটুকু এরা হারাতে বসেছে। অটলবিহারী বাজপেয়ী কত বড় মানুষ ছিলেন, কতবড় রাজনীতিক ছিলেন সেটার থেকেও বড় তিনি ‘ভারতরত্ন’ ছিলেন। তাঁকে সম্মান জানাতে না পারাটা খুব ছোট মনের পরিচয়। তাঁর প্রয়াণে আমি শোক এবং শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।”

১৯৪২ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় অটলজির যোগদান এবং পরে চাপে পড়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে তাঁর মুচলেকা দেওয়া নিয়ে সারাজীবন বিতর্ক রয়েছে। মৃত্যুর পরও এই বিষয়ের উল্লেখ করে অনেকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে সমালোচনা করেন। পুরো ঘটনায় মর্মাহত ইতিহাসের অধ্যাপিকা তনভির নাসরিন৷ তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত অন্যায় এবং অপপ্রচার। এই অপপ্রচার কিন্তু আমরা আগেও দেখেছি। এই একইভাবে প্রফুল্ল সেনকে চোর বলা হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথকে বুর্জোয়া কবি এমনকী নেতাজীকে তোজোর কুকুর বলা হয়েছিল। এটি একটি পরিকল্পনার অঙ্গ। যার মাধ্যমে অন্যকে ছোট করে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’’

- Advertisement -

তিনি আরও বলেন, ‘‘অটলজির মুচলেকার ভিত্তিতে ১৯৪২ সালে লীলাধর বাজপেয়ীর জেল হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। কিন্তু পরে তদন্তে দেখা গিয়েছে কোর্টে যে কাগজপত্র পেশ করা হয়েছিল, যার ভিত্তিতে লীলাধর বাজপেয়ীর পাঁচ বছরের জেল হয় তাতে অটলজির মুচলেকাটি ছিলই না। এক তরুণ যিনি তখন উর্দু জানতেন না তাঁকে দিয়ে উর্দুতে লেখা একটি মুচলেকাপত্র সই করিয়ে নেওয়া ব্রিটিশ সরকারের জন্য মোটেও কঠিন কাজ ছিল না সেই সময়।”

তনভির নাসরিনের যুক্তির পাশাপাশি থাকবে সেই মুচলেকার একটি অন্য দিকও৷ মুচলেকায় দেখা গিয়েছে, বিয়াল্লিশে বাতেশ্বর গ্রামে আন্দোলন চলাকালীন ধৃত অটলবিহারী বাজপেয়ী উর্দু ভাষায় লেখা বয়ানের নিচে সই করেছিলেন৷ কিন্তু সেই বয়ান তাঁকে পড়ে শোনানো হয়েছিল বলে নিচে আরও একটি সই করেছিলেন তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট৷ বিতর্ক এখানেই৷ পরে বহুবার এই বিষয়টি অটলবিহারী বাজপেয়ীকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়৷ প্রতিবারই তিনি বলেছিলেন-‘ সত্যিটা লুকিয়ে রয়েছে দুটোর মাঝখানে৷ ‘

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং কবি অংশুমান কর কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ীর অতীত নিয়ে বিতর্ককে এড়িয়ে গেলেন না। তিনি স্পষ্ট বলেন, “যে কোনও ধর্মনিরপেক্ষ শান্তিকামী মানুষ অটলজির অতীত নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। কিন্তু কারও মৃত্যুর পর কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার কখনওই সমর্থন যোগ্য নয়।”

কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ” অটলজি ভারতকে প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে সক্ষম কর তুলেছেন। বিশ্বের দরবারে ভারতের অস্তিত্বকে শক্তিশালী করেছেন। তার প্রয়াণে যারা এধরনের নোংরামো করছেন তাদের প্রতি করুণা হয়। অটলজি আমাদের সবার শ্রদ্ধেয়। ওনার থেকে সবার অনেককিছু শেখার রয়েছে।”

Advertisement ---
---
-----