ভালো নেই বাংলা গান, লড়াইয়ে একজোট শিল্পীরা

 ‘গান তুমি হও গরমকালের সন্ধেবেলার হাওয়া অনেক পুড়ে যাবার পরে খানিক বেঁচে যাওয়া’- বাংলা গানের সঙ্গে বাঙালি শ্রোতা তো এমনই নিবিড় আত্মিক সম্পর্কে বাঁধা৷ বাংলা গানের সারেঙ্গি থামে না বলেই তো বাংলা গালের শিল্পী স্বপ্ন দেখেন, ‘আমি যদি আর নাই আসি হেথা ফিরে, আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’৷ কিন্তু গেছে যে দিন সে কি একেবারেই গেছে? সত্যি কি বাঙালি আর তেমন বাংলায় গান গায়? নতুন বাংলা গান গায়? যদি গায়, তাহলে কেন ভালো নেই বাংলা গানের সংসার? বাংলা গান, বিশেষত ননফিল্ম বাংলা গানের সংসারের মানুষদের কথাতে কিন্তু স্পষ্ট যে, ভালো নেই বাংলা গান৷ গায়ক-সুরকার-গীতিকার অনিন্দ্য বসু এবং সুরকার জয় সরকার রীতিমতো ফেসবুকে স্টেটাস দিয়েছেন বাংলা গানের ঘর বাঁচাতে৷

 শেষ কবে বাঙালি শ্রোতা বাংলা গানের অ্যালবাম কিনেছেন, কিংবা আধুনিক বাংলা গানের খোঁজখবর নিয়েছেন, তা ভাবতে অনেকেরই খানিকটা সময়ই লাগছে বটে৷ এক সময় পুজোর গানে মাতোয়ারা বাঙালি এখন সব গান শোনাকেই নস্ট্যালজিয়ার গোল্ডেন ছাপ দিয়ে তুলে রেখেছে৷ ফলে ভালো নেই বাংলা গানের সংসার৷ নতুন গান তৈরি হচ্ছে বটে, কিন্তু সে গান শ্রোতাদের কাছে তেমন পৌঁছচ্ছে কি? এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত লোপামুদ্রা মিত্র, শ্রীকান্ত আচার্য়, রূপঙ্কর, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, শুভমিতা প্রভৃতি শিল্পীর গান  কিংবা ব্যান্ডের গান-বাঙালি শ্রোতা নতুন গানের জন্য উৎসুক হয়ে থাকত৷ কিন্তু মাত্র কয়েক বছরেই সে আবেগ প্রায় ফিকে হয়ে গেছে৷ এতে যেমন সংকটে বাংলা গান ও গানের শিল্পীরা, তেমন সংকটে বাংলা গানের ইতিহাসও৷ যে প্রবহমানতা বাংলা গানের ইতিহাসের সম্পদ, তা যেন হঠাৎই গতিরুদ্ধ৷কিন্তু কেন এমন হল?

শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগ যে কোনও একটা কারণে হয়ে উঠছে না, জানেন শিল্পীমহল৷ ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা আজও যাঁর গানে দিশেহারা হয়, সেই অনিন্দ্য বসু সোশ্যাল মিডিয়ায় শ্রোতাদের কাছেই জানতে চেয়েছেন, কীভাবে, কোন উপায়ে তাঁদের কাছে আরও পৌঁছনো যায়৷ তিনি লিখেছেন, ‘.. কী করে আপনাদের কাছে আমরা আমাদের গানগুলো পৌঁছে দেব? বিশ্বাস করুন কোনও মাধ্যম পাওয়া যাচ্ছে না, অস্তিত্বের সংকট তৈরি হচ্ছে প্রবলভাবে-বাংলা ভাষার, এই সময়ের বাংলা গানের, আগামির ইতিহাসের৷ প্লিজ আপনাদের সাজেশন এবং সহয়োগিতা কাম্য…কারণ আপনারা মানে শ্রোতারাই পারেন এই সংকট থেকে বাংলা গানকে মুক্ত করতে৷’’ শ্রোতাদের কাছে আবেদনের পাশাপাশি তিনি সমস্ত শিল্পীবন্ধুদেরও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই সংকট শ্রোতাদের গোচরে আনার আর্জি জানান৷ একই রকম আক্ষেপ ঝরে পড়ে সুরকার জয় সরকারের লেখাতেও৷ যতদূর বুক ভেসে যায় ততদূর গানের পাখিকে যিনি একসময় যেতে বলেছেন তিনিই খেদ জানিয়ে বলেছেন, ‘‘আবার একটা পুজো আসছে …. আবার কিছু নতুন বাংলা গান তৈরী হবে….আবার সেই গানগুলো শ্রোতাদের কানে যথারীতি পৌঁছাবেনা….কারণ আমাদের রেডিও স্টেশন গুলো আর বেসিক ( ননফিল্ম ) বাংলা গান বাজায় না, শ্রোতারাও আর দোকানে গিয়ে সিডি কেনেন না ৷ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে, নিজের শিল্পীসত্বা কে বাঁচিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে ৷ একটা নতুন লড়াই চাই নতুন বাংলা গানের জন্যে !’’

- Advertisement -

বিগত বেশ কয়েক বছর হল ননফিল্ম গানের শিল্পীরা তেমন করে নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করেননি৷  রবীন্দ্রনাথের গানের অ্যালবাম যে হারে প্রকাশিত হয়েছে তার তুলনায় নতুন ননফিল্ম বাংলা গানের অ্যালবামের সংখ্যা প্রায় হাতেগোণা৷ সংকটবেশ কিছুদিন আগে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল৷ যে বাঙালি শ্রোতারা ‘বেণীমাধব’, ‘বৌদিমণির কাগজওয়ালা’, ‘চাঁদ কেনো’-র সুরে মেতে উঠেছিল তারাই হঠাৎ মুখ ফিরিয়েছে৷ বাস্তবিক কি মুখ ফিরিয়েছে? নাকি সে জায়গা দখল করে নিয়েছে বাংলা ছায়াছবির গান?  নাকি সময় পেরিয়ে যে প্রজন্ম পালটে গেছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান তেমন পালটায়নি?  জেনারেশন হোক কিংবা কমিউনিকেশন কোথাও যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা নিশ্চিত৷ প্রসঙ্গত হিন্দিতেও যে ননফিল্ম গানের অ্যালবামের চল ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তা বেমালুম হাওয়া৷ অবস্থা এরকম যে, ছবির বাইরে আর কোনও হিন্দি গান হয় কি না, তাইই সামনে আসে না৷ সে অশনিসংকেত দেখেই লড়াইয়ে একজোট হয়েছেন শিল্পীরা৷

বাংলা গানের স্বর্ণযুগের আভা একসময় প্রায় ফিকে হয়েই এসেছিল৷ বাংলা গান আধুনিক বা ছায়াছবির-কোনওটিই আর শ্রোতাদের টানতে পারছিল না একসময়৷ গৌতম চট্টোপাধ্যায় এবং আরও নির্দিষ্ট করে সুমন এসে বাংলা গানকে সেই অন্ধকার থেকে বের করে এনেছিলেন বলা যায়৷ নচিকেতা চক্রবর্তী, অঞ্জন দত্ত থেকে বাংলা ননফিল্ম গানের একের পর এক শিল্পী যখন বাংলা গানের ইতিহাসকে কাঙ্ক্ষিত অভিমুখ দিচ্ছেন, তখনও গুটিকয় ছাড়া প্রায় উল্লেখ্যই ছিল না বাংলা ছায়াছবির গান৷ বিগত এক দশকের হিসেব ধরলে সেই ছবিটাই প্রায় উলটে গেছে৷ কিন্তু তারকারণ কখনওই ভালো গান তৈরি হচ্ছে না এমন নয়৷ বরং বড় প্রোডাকশন হাউসের মার্কেটিং, প্রমোশনের কাছে প্রায় চাপা পড়ে যাচ্ছে বাংলা ননফিল্ম গান৷ গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো আছে পাইরেসি৷ প্রায় সব শিল্পীর অ্যালবামেরই পাইরেটেড ভার্সন বিক্রি হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগাতেই৷ ফলে ব্যাপকভাবে মার খেয়েছে ও খাচ্ছে বাংলা গানের ইন্ডাস্ট্রি৷ একদিকে অসম প্রতিযোগিতা অন্যদিকে চোরাকারবারীদের অসাধুতার দ্বৈতচক্রে পড়ে বাংলা ননফিল্ম গান এই মুহূর্তে বেশ কোণঠাসাই৷

কিন্তু শ্রোতারা কি মুখ ফিরিয়েছেন বাংলা গান থেকে? বাংলা গান শোনার রেওয়াজ যে কমেছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই৷ আজ অবশ্য অনুরোধের আসরে অপেক্ষায় উৎসুক শ্রোতা খুঁজে পাওয়া বিরল, তবু শ্রোতা নেই তা নয়৷ অভাব সম্ভবত যোগাযোগের৷ আইটিকর্মী শুভঙ্কর সাঁতরা যেমন বললেন, ‘‘আমি তো বাংলা গান শুনি, কিন্তু ইদানিং নতুন অ্যালবামের তো খবরই পাই না৷ রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম বেরোই এটাই দেখি৷ সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোথাও নতুন গানের খবর দেখি না তেমন৷ রেডিওতেও হয় পুরনো গান, নয় সিনেমার গান শোনায়৷ আমার তো এখনও শুনতে ইচ্ছে করলে পুরনো অ্যালবামগুলোই বের করে শুনি৷’’  ক্রমাগত রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবামের প্রকাশ এবং সে সব অ্যালবামের গুণমান যে বাঙালি শ্রোতাকে বাংলা গানের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে তা সন্দেহ নেই৷ রেডিও স্টেশনগুলির মধ্যেও নতুন অ্যালবামের গান শোনানোর সংখ্যা মাত্র কয়েকটি৷ এমনকী সিনেমার গানের বিপুল প্রচারিত বিখ্যাত শিল্পীর বেসিক গানের অ্যালবামও আটকে থেকেছে ইউটিউবের লাইকের জনপ্রিয়তায়৷   প্রচারসর্বস্ব যুগে বাংলা বেসিক গান তাই ক্রমশ সরে সরে গেছে পিছনের দিকে৷

বাংলা ছায়াছবির ফিলহাল সময়ের গান, তা যেমনই হোক না কেন, অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে প্রচারের দৌড় কতদূর৷ বাংলা গানের সংসারে তো কথা-সুর কোনওদিনই বাড়ন্ত ছিল না, তাহলে কি অভাব এই প্রচারেরই? শ্রোতাদের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগের? নাকি সঠিক মাধ্যমের? সংকট ঘনীভূত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা কাটিয়ে তুলতে পারেন শিল্পী-শ্রোতা মিলেই৷ অনিন্দ্য, জয়রা যে প্রচেষ্টা নিয়েছেন তাতে সামিল হয়েছেন আরও অনেকেই৷ বহু অনুরাগী সরাসরি জানাচ্ছেন নিজের মতামত৷ হয়তো সকলে হাতে হাত, মতে মত মেলালে, জীবনবিমুখ গানের সমকালে বাঁচার লড়াইয়ে তাল দিয়ে ফিরে আসুক বাংলা গান, খরা কেটে সজীবতায় ভরসা দেওয়া সফল সৃষ্টিতে আবার জেগে উঠবে গান৷

সরোজ দরবার

Advertisement
---