সৌমেন শীল, বেঙ্গালুরু: দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরু ভারতের তথ্য-প্রযুক্তি শিল্পেরও রাজধানী। এই শহরে ২০০০ টিরও বেশি তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থা রয়েছে। কৃষি এবং উৎপাদন শিল্প থাকলেও তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প এই রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। চার দশক আগে এই শহরে যাত্রা শুরু করেছিল তথ্য-প্রযুক্তি।

দ্রাবিড়ভূমির এই উন্নয়নের পিছনে অন্যতম বড় ভূমিকা ছিল বাংলার। আরও ভালো ভাবে বললে বাংলার বামপন্থীদের। সৃজনশীল মানুষদের রাজ্য বাংলায় প্রথমে তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল কেন্দ্র। কিন্তু সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বামেরা। সেই সময় বাংলায় সদ্য উড়তে শুরু করেছে শাসকের লাল পতাকা।

রাজ্যে কিছুতেই কম্পিউটার প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। এই দাবিতে আন্দোলন শুরু করে বাম দলগুলি। রাজ্যের শাসকদল হওয়ার কারণে সেই আন্দোলনের ভিত ছিল বেশ মজবুত। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ছিলেন আন্দোলনের পুরোভাগে। তাঁদের যুক্তি ছিল, প্রযুক্তি গ্রাস করবে কর্মসংস্থানকে। রাজ্যে কম্পিউটারের মতো প্রযুক্তি প্রবেশ করলে কর্মহারা হবেন বহু মানুষ।

যুক্তিটা কিন্তু খুবই গ্রহণীয় ছিল। কম্পিউটারের সাহায্যে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যায় খুব সহজেই। ১০ জন শ্রমিকের কাজ দুই জনে করে দিতে পারলে বাকি আট জন হয়ে যাবেন কর্মহীন। অন্যদিকে, সেই সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত সারিয়ে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করেই দ্রুত উন্নতি করছে জাপান। যেখানে কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির বহুল ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছে। সুতরাং প্রযুক্তির গুঁতোয় পেটে লাথি পড়বে কৃষকেরও।

মেহনতি মানুষের কথা বলে, কাস্তে-হাতুড়ি প্রতীক নিয়ে ক্ষমতায় আসা বামফ্রন্টের পক্ষে এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। কাস্তে-হাতুড়ির পক্ষ নিতে গিয়ে সেদিন বামেদের পরিত্যাগ করতে হয়েছিল মাউস-কিবোর্ড।

প্রায় ২০০০ কিমি দূরের শহর কলকাতার পরিত্যাগ করা প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পকে লুফে নিয়েছিল বেঙ্গালুরু(তৎকালীন বেঙ্গালোর)। খুব অল্প সময়েই উন্নতির শিখরে পৌঁছে যায় বেঙ্গালুরুর তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প। এই মুহূর্তে দেশের সবথেকে বেশি ইঞ্জিনয়র তৈরি হয় এই শহর থেকেই। তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প থেকে বার্ষিক আয়ের পরিমান প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক দলগুলিকে ভোট চাইতে হয় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কর্ণাটকের রাজধানী শহর বেঙ্গালুরু সেখানে ব্যতিক্রম। বিধানসভা নির্বাচনে যুযুধান দুই পক্ষ কংগ্রেস-বিজেপি পরস্পরের দূর্নীতি তুলে ধরেছেন নিজেদের স্বচ্ছ প্রমাণ করতে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, দশ বছরের ইউপিএ জামানার দূর্নীতি ছিল বিজেপি-র প্রচারের অস্ত্র। যেগুলির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কর্ণাটক রাজ্যর যোগ নেই। অন্যদিকে, কংগ্রেস হাতিয়ার করেছিল ওবলাপুরম খাদান দূর্নীতিতে জড়িত রেড্ডি ভাইদের সঙ্গে বিজেপি নেতাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ফুটেজ। সেই দূর্নীতি আবার অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের।

তবে, বেঙ্গালুরু শহর এবং রাজ্যের সংলগ্ন এলাকার উন্নতির পিছনে সেভাবে রাজনীতির যোগ নেই। এমনই মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং কর্মসূত্রে আসা প্রবাসীরা। বিটিএম নগরের বাসিন্দা অভিষেকের মতে, “শহরের সাধারণ মানুষ সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তথ্য-প্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। সকলের স্বার্থেই উন্নয়ন যা হওয়ার হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল বা প্রশাসনের বিশেষ কোনও ভূমিকা নেই।” একই মত প্রকাশ করেছেন ইলেক্ট্রনিক সিটি এলাকার বাসিন্দা আকাশ। তাঁর কথায়, “যা উন্নয়ন হয়েছে সেটার প্রয়োজন ছিল। তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প থেকে প্রাপ্ত করের টাকাতেই সব হয়েছে।” রাজনীতি নিয়ে সাধারণের বিশেষ মাথাব্যাথা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

বেঙ্গালুরুর বসন্ত নগরের কুইনস রোডে অবস্থিত প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির পার্টি অফিস। ভোটের দিন দুই আগে সেই অফিসের সামনে আলাপ হয়েছিল স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ভেঙ্কাটেশের সঙ্গে। কর্ণাটকের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চাওয়ায় তিনিও রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে প্রায় একই মত পোষণ করলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল যে বেঙ্গালুরুতে উন্নয়ন অতিরিক্ত কিছুই হয়নি। রাজ্য-কেন্দ্রে একই সরকার ছিল বলে ‘৮০-র দশকের শুরুতে তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প এসেছিল। এরপর থেকে কখনও তেমন হয়নি। রাজনৈতিক তরজায় থমকে গিয়েছে উন্নয়ন। রাজ্যে এবং কেন্দ্রের শাসনে একই দলের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী কর্ণাটকবাসী।

--
----
--