আতঙ্কিত তিলোত্তমা নিশুতি রাতেও নিরাপদে একা চষে বেড়ায় বেঙ্গালুরুতে

রানা দাস, বেঙ্গালুরু: প্রায় দিন পনেরোর ব্যবধানে দু’টি ঘটনা সোস্যাল মিডিয়ায় ঝড় বইয়ে দিয়েছিল কলকাতা। প্রথম ঘটনাটি হল, পাতালপথে এক যুগলের আলিঙ্গন (!) করাকে কেন্দ্র করে। অন্য ঘটনাটি হল, প্রিয়াঙ্কা দাস নামে এক কলেজ ছাত্রীর সামনে এক হকারের অভব্য আচরণ। যা একটা সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ প্রকাশ্যে করতে পারে না। প্রথম ঘটনায় আলিঙ্গন (!) করার জন্য কিছু মানুষ প্রতিবাদের নামে যুগলকে মারধর করে।

রানা দাস, বেঙ্গালুরু

অন্য ঘটনায় ওই কলেজ ছাত্রী প্রতিবাদ করার জন্য বাসের কোন সহযাত্রীকে পাননি। বাধ্য ভীতি সন্ত্রস্ত ওই কলেজ ছাত্রীর তোলা ভিডিও ফুটেজটি সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতেই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রশ্ন, এখানেই যে, পথেঘাটে কলকাতায় কতটা নিরাপদ মহিলারা? কারণ, বিগত কয়েক বছর কলকাতা শহর কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। এখন অনেক মহিলাকেই বলতে শোনা যায়, বাড়ি থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে বেশি রাতে ঘরের বাইরে না থাকতে।

কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচন করতে এসেই বেঙ্গালুরুতে বসেই কলকাতায় সদ্য ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় ঘটনা জানতে পারি সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই। আমার অফিসের এক পুরনো সহকর্মী তনুজিত দাস খবরটি করে তাঁর এখনকার সংবাদমাধ্যমে। সেই খবরটা পড়েই ঘটনাটি জানতে পারি প্রথম। এই দুই ঘটনা ছাড়া রাতের কলকাতার সুরক্ষা নিয়ে আরও বেশ কিছু ঘটনা আগেও ঘটছে। বার বার প্রশ্ন উঠেছে, রাতের কলকাতার নিরাপদ নিয়ে। সেদিনই এই ঘটনাটি জানার পরেই বেঙ্গালুরু শহরের ইন্দিরা নগরে এক বাঙালি রেস্টুরেন্টেই পরিচয় হল সোনালি সেনগুপ্ত নামে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে। 2001 সাল থেকে তিনি এই বেঙ্গালুরু শহরে বসবাস করেছেন। প্রকৃত বাড়ি কলকাতার বালিগঞ্জের হাজরা রোডে। বেঙ্গালুরু ইন্দিরা নগরের এই বাঙালি রেস্টুরেন্টটি তিনি চালান।

- Advertisement -

কলকাতার কলেজ ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা দাসের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাপারটি জানার পর থেকেই কেন জানি কলকাতার সঙ্গে বেঙ্গালুরুর তুলনা করতে ইচ্ছে হল। কলকাতা না বেঙ্গালুরু? কোন শহরকে আপনি নিরাপদ বলে মনে করেন? সোনালিদেবীর কাছে এই প্রশ্ন করতেই, তিনি বললেন, দেখুন আমি 2001 সাল থেকে বেঙ্গালুরু শহরে বসবাস করছি। সত্যি বলছি, কোনদিন কোন বিপদের মুখে পড়তে হয়নি। এই রেস্টুরেন্ট থেকে আমি রোজ রাত 11টার পর বাড়ি ফিরি। একা এবং পায়ে হেঁটে। রাস্তায় কোনদিন কোন বিপদের মুখে পড়তে হয়নি। এমন কী, কোন মহিলার সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে বলে শুনিনি। এখানে খুব নিরাপদে রাত-বিরাতে যে কোন বয়সের মহিলারা যাতায়াত করে।

আর কলকাতার প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বললেন, আমরা ছোটবেলাটা কলকাতায় কেটেছে। তখন কিন্তু এমনটা ছিল না। কিন্তু, এখন প্রায় নানা ঘটনা শুনতে পাই। এখন মাঝে মধ্যে কলকাতার বাড়িতে গেলেই, মা-র নির্দেশ এয়ারপোর্ট থেকে একা একা আসা যাবে না। দিনকাল ভালো নয়। সে রাত হোক কিংবা দিন। বাড়ি থেকে গিয়ে লোক এসে এয়ারপোর্ট থেকে বালিগঞ্জে নিয়ে যায়। এ থেকেই স্পষ্ট যে, কলকাতার এখন আর নিরাপদ নয়। এখন তো বেশি রাতে বাড়ির বাইরে থাকতে বারণ করা হয়। কিন্তু, দেখুন এই বেঙ্গালুরুতে এসবের কোন বালাই নেই। যত রাত হোক না কেন একজন মহিলা নিরাপদে একা পথে বেরোতে পারে।


রবিবার কলকাতা24×7 এ কর্ণাটকের শান্ত ভোট সংক্রান্ত আমার প্রতিবেদটি প্রকাশের পরেই সোস্যাল মিডিয়াতে যোগাযোগ করে বেঙ্গালুরু তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত এক যুবতি। অন্যন্যা চৌধুরি নামে ওই যুবতি মেসেজ লিখে জানান, এমন শান্তির ভোট আগে কোনদিন দেখেনি। কথা বাড়িয়ে জানতে পারলাম, অন্যন্যার বাড়ি বারাসতে। গত আটমাস আগে চাকুরি সূত্রে এই বেঙ্গালুরু শহরে এসেছেন। থাকেন বেল্লানদুর বলে এক এলাকায়। তাঁর অফিসে বাড়ি থেকে ১৮ কিলোমিটার দুরে হোয়াইট ফিন্ডে। এখানে ভোটে যেমন কোন উত্তেজনা নেই, নেই হিংসা-হানাহানি, তেমনি অন্যন্যা নিজেই আগ বাড়িয়ে বললেন, এই বেঙ্গালুরু শহর কিন্তু কলকাতার থেকে অনেক সেফ সিটি। কলকাতার মতো ডেঞ্জারেস নয়।

উতসাহ নিয়েই তাঁর সঙ্গে শহরের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বাড়ালাম। তিনি যা জানালেন, তাতে তাজ্জব হওয়ার মতো কথা। যা কোনদিন কলকাতায় সম্ভব নয়। তিনি বললেন, ‘আইটি সেক্টরে রাতের শিফটে কাজ করতে হয়। প্রায়দিন গভীর রাত করে ঘরে ফিরতে হয়। এমন কী, রাত ২টার সময়ও বাড়ি ফিরতে হয়।’ অত রাতে অফিস ছুটির পর নিশ্চয় অফিসের গাড়িতেই ফেরেন। এতে বিপদের কী আছে? হাসতে হাসতে অন্যন্যা বললেন, ‘অফিস ক্যাবে যাওয়া যায়। কিন্তু, ক্যাব অনেককে নামাতে নামাতে যায়। তাই অনেক লেট হয় বাড়ি ফিরতে। তাই কেউ ক্যাবের ভরসা করে না। আমিও করি না’। তাহলে এত রাতে বাড়ি ফেরেন কী করে? উত্তরে অন্যন্যা বললেন, আমার স্কুটি আছে। ওটাই ভরসা। স্কুটি চালিয়ে একা বাড়ি ফিরি। হ্যাঁ, রাত ২টার সময়, ১৮ কিলোমিটার পথ স্কুটি চালিয়ে।’

অন্যন্যার কথাটা শুনে প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তিনি সেটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘হ্যাঁ দাদা এটাই সত্যি। এখানে গত আটমাস ধরে আছি। কোনদিন কোন অসুবিধা হয়নি। আমি যে এত রাতে এই ভাবে বাড়ি ফিরি, সেটা বারাসতে থাকা বাবা-মা ভালো করেই জানেন। সত্যি কলকাতা থেকে অনেক বেশই এই বেঙ্গালুরু শহর। আজ পর্যন্ত আমি কোন চুরি-ছিনতাই ঘটনার কথা শুনিনি। অনেক রাত অবধি রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেরিয়েছি, কোন বিপদের মুখে পড়তে হয়নি বা বিপদের গন্ধ পাইনি। যা কলকাতা শহরে কোনভাবেই ভাবা যায় না।

শুধু কলকাতার এই দুই মহিলাই নয়, কলকাতা থেকে বেঙ্গুলুরু শহর যে বেশ নিরাপদ, তা নিজেই টের পেয়েছি গত চার-পাঁচদিনে। ১২ মে ছিল কর্ণাটক বিধানসভা ভোট। সেদিন ভোট সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম মিডিয়া সেন্টারে। সেখানে কোন গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ইনফ্রান্ট্রি রোড থেকে বেশ কিছুটা দুরে আমাদের গাড়িটি রাখতে হয়েছিল। বেশিক্ষণ থাকব না এটা ভেবেই গাড়িতে রেখে যাই আমাদের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। তার সঙ্গে আমার ম্যাকবুকটাও গাড়িতেই রেখে দিয়েছিলাম। ঘণ্টাখানেক বাদে মিডিয়া সেন্টার থেকে ফিরে গাড়ির কাছে এসে দেখি, আমাদের ড্রাইভার দাদা নাক ডাক দিয়ে ঘুমচ্ছে। দরজা এবং গাড়ি কাঁচ খোলা। পিছনের সিটে পড়ে রয়েছে আমার দামি ম্যাকবুকটা। ড্রাইভারের কোন হুঁশ নেই। অনেক ডাকাডাকির পর তাঁর ঘুম ভাঙাতে পারি। মনে মনে একটাই শঙ্কা, ওনার এই ঘুমের সুযোগে যে কেউ আমার ম্যাকবুকটা নিজের মতো করে তুলে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু, তা দেখলাম নিরাপদেই রয়েছে। এটা হয়তো বেঙ্গালুরু বলেই সম্ভব হল। কলকাতায় কোনদিন এই ভরসাটা করতে পারতাম না। তারজন্য হয়তো আমাকে লালবাজারে ছুটতে হত।

সামান্য দু’তিনটি ঘটনা দিয়ে কোনও মতেই বিচার করা সম্ভব নয় , কলকাতার তুলনায় বেঙ্গালুরু অনেক বেশি নিরাপদ। তথ্য-পরিসংখ্যান ছাড়া এই বিচার করা উচিত নয় বলেই মনে হয়েছে। একথা মাথায় রেখে তথ্য সংগ্রহে জোর দিলাম। তাতে সত্যিই তাজ্জব করার মতোই পরিসংখ্যান হাতে এল। তাতে বেঙ্গালুরু গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, হ্যাঁ তিলোত্তমা আমরা তোমার থেকে অনেক নিরাপদ। সুরক্ষার দিকে থেকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তোমাকে পিছন ফেলে। ২০১৪ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো অফ ইন্ডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যা অনুযায়ী, প্রতি এক লাখ মহিলার মধ্যে বেঙ্গালুরুতে আড়াই জন মহিলা ধর্ষণের ঘটেছে। সেখানে ২০১৩-২০১৪ সালের কলকাতার প্রতি দু’লাখ মহিলার মধ্যে একজন মহিলা ধর্ষণ হয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ার এই রিপোর্ট প্রকৃতপক্ষে কলকাতাকে বেশি সুরক্ষিত বলে প্রমাণ করছে। কিন্তু, যদি এই রিপোর্ট বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাচ্ছে কলকাতায় মহিলা ধর্ষণের ঘটনা উর্ধ্বমুখি। তাতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৩ সালের কলকাতা শহরে ৩৬টি মহিলা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে এই সময়ে বেঙ্গালুরুতে মহিলা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১০৪টি। ২০১৪ সালের কলকাতায় ৭৫টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আর সেই সময়কালে বেঙ্গালুরুতে ৮০টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভূক্ত হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে কলকাতায় ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুন হয়েছে, অন্যদিকে বেঙ্গালুরুতে ২০টি ধর্ষণের ঘটনা কমেছে। কলকাতা যেখানে ক্রাইম রেখাচিত্র উপরের দিকে, সেখানে সেখানে বেঙ্গালুরুর রেখাচিত্র নিচের দিকে।


এত গেল কলকাতা এবং বেঙ্গালুরুর সঙ্গে তুলনা। যদি পশ্চিমবঙ্গ এবং কর্ণাটকের সঙ্গে তুলনা করা যায, তবে পরিসংখ্যানটি রীতিমতো আতঙ্কের। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে প্রকাশিত ‘রেপ ম্যাপ’টি বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি জলের মতো পরিস্কার হয়ে যাবে। ২০১১ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলার মোট ২৩৬৩টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভূক্ত হয়েছে। সেখানে ওই বছর কর্ণাটকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৬৩৬টি। এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট যে, বাংলার তুলনায় কর্ণাটকে মহিলারা চারগুন বেশি সুরক্ষিত।


দেশের নামী সংবাদ সংস্থা দি হিন্দু’র একটি সমীক্ষায় ধরা পড়েছে কলকাতার তুলনায় বেঙ্গালুরু কতটা নিরাপদ। এই সংবাদ সংস্থাটি দেশের সেরা দশ অপরাধ প্রবণ শহরের তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে গুরগাঁও। তার পরেই ক্রমানুসারে রয়েছে ইন্দোর, নয়দা, দিল্লি, নাভি মুম্বই, কানপুর, মাদুরাই, কলকাতা, মুম্বই এবং লখনউ। কুখ্যাত দশের তালিকায় কিন্তু নেই সিলিকন ভ্যালি অফ ইন্ডিয়া বেঙ্গালুরু। এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে ক্রাইম ইনডেক্স কলকাতা ৫০.৬৬ শতাংশ বিপজ্জনক। আর সেফটি ইনডেক্সে ৪৯.৪৪ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবে বলা যেতেই পারে কলকাতা যতটা নিরাপত ঠিক ততটাই বিপজ্জনক শহর।


তথ্য, পরিসংখ্যান এবং সাধারণ মানুষের মতামত থেকে স্পষ্ট কলকাতার তুলনায় বেঙ্গালুরু অনেক বেশি সুরক্ষিত মহিলাদের জন্য। AwaazNation নামে একটি সংবাদ সংস্থার সমীক্ষায় তুলে ধরা হয়েছে দেশের দশটি শহরের কথা। যেখানে বলা হয়েছে, বসবাস এবং কর্মস্থল হিসেবে কোন কোন শহর কতটা নিরাপদ। এই তালিকায় বলা হয়েছে, এই দুই ক্ষেত্রে সব থেকে নিরাপদ হল মোদীর রাজ্য গুজরাতের সুরাট শহর। তার পরেই ক্রমানুসারে রয়েছে, জয়পুর, চেন্নাই, মৌসুরি, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, পুনে, মুম্বই, আহমেদাবাদ। এ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কলকাতার উপরেই রয়েছে বেঙ্গালুরু শহর। কলকাতাকেও হার মানিয়েছে এই শহর। আর সেই কারণেই হয়তো বেঙ্গালুরুতে বিশ্বের সব থেকে বেশি সংখ্যক সফটওয়ার এবং হার্ডওয়ার ইঞ্জিনিয়ার বসবাস করে। প্রায এক মিলিয়ন সমান ভিন দেশ ও ভিন রাজ্যের তথ্য-প্রযুক্তি কর্মী এই বেঙ্গালুরুতে বসবাস করে। AwaazNation সংবাদ সংস্থাটি জানাচ্ছে, ভারতের সবথেকে বন্ধুত্বপূর্ণ শহর এই বেঙ্গালুরু। আমরা বঙ্গবাসীরা বরাই করে বলি, আজ যা বাংলা ভাবে, পরে তা সারা দেশ ভাবে। কিন্তু, সুরক্ষার প্রশ্নে বেঙ্গালুরু যা ভাবতে পারে, কলকাতা কেন তা পারে না?

Advertisement ---
-----